Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / জাতীয় / অটিজম ও প্রতিবন্ধী কখনোই এক নয়

অটিজম ও প্রতিবন্ধী কখনোই এক নয়

atijom
আমাদের এটাই মনে রাখতে হবে- অটিজম এবং প্রতিবন্ধী কখনওই এক নয়। অটিজম হচ্ছে শিশুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা। এ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও সঠিক ভাষা প্রয়োগে সমস্যা হয়ে থাকে। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আজ।

এবার নবমবারের মতো পালিত হচ্ছে দিবসটি। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘অটিজম লক্ষ্য ২০৩০ : স্নায়ু বিকাশের ভিন্নতার একীভূত সমাধান’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনগুলোও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বেলা সাড়ে ১০ টায় নীল বাতি জ্বালিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, অটিস্টিক শিশুরা আমাদেরই প্রিয় সন্তান। ভালোবাসা, যত্ন ও সেবা দিয়ে তাদের লালন পালনের পাশাপাশি কর্মদক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। কারণ উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই অটিস্টিক শিশুকে কর্মদক্ষ করে তোলে।

দিবসটি উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন অটিস্টিক শিশু কিশোরদের সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করে পরিবারের স্নেহ, ভালবাসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তোলা হলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝা না হয়ে অপার সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

অটিস্টিক শিশুর শনাক্তকরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদানে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সিনাক’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় অটিস্টিক শিশুদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক ধারণা ছিল। বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী কর্মসূচি গ্রহণের ফলে অটিস্টিক শিশু ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জন্য আর্থ-সামাজিক সহায়তা’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে । এ প্রস্তাব উপস্থাপনকারী গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিসিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ-এর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন সায়মা হোসেন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ‘এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হয়েছেন।

অটিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ আউটোস থেকে। অর্থাৎ আত্ম বা নিজ। বিশেষ ধরনের স্নায়ুবিক (ডিসঅর্ডার অব নিউরাল ডেভেলপমেন্ট) সমস্যাই হলো অটিজম। অটিস্টরা আমাদের চারপাশের জগত থেকে নিজেদের কিছুটা আড়াল করে রাখে। তাদের নিজস্ব একটা মনোজগতে বসবাস করে। ফলে অনেক সময় এদের আচরণও হয় অস্বাভাবিক। সহজ করে বলতে গেলে এই ধরণের রোগীকে আমরা সাধারণত হাবাগোবা বলেই চালিয়ে দেই। তবে এ ক্ষেত্রে তাদেরকে মানসিক রোগী বলা যাবেনা। আচরণগত সমস্যা হিসেবে মানিয়ে নিতে হবে।

এ ব্যাপারে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ডা. উম্মে সায়কা নীলা বলেন, ‘অটিজম একটি মানসিক বিকাশগত সমস্যা যা সাধারণত জন্মের পর প্রথম তিন বছরের মধ্যে হয়ে থাকে। এই সমস্যার জন্য সামাজিক বিকাশ ও সামাজিক যোগাযোগ যেমন কথা বলা, ভাব বিনিময় করার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তীব্র আলো, শব্দ, গন্ধ এসব সহ্য করতে পারে না অটিস্টরা। মানুষের সঙ্গে, এমনকি আপন জনের সঙ্গেও ভাববিনিময় করতে পারে না।’

১৯১১ সালে সর্বপ্রথম সুইস মনোবিজ্ঞানী অয়গেন ব্লয়লার অটিজমকে এক ধরনের মনোরোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কয়েক দশক পরে রোগটি নিয়ে গবেষণা আরো বিস্তৃত হয়।অটিজম মস্তিস্কের অস্বাভাবিক বায়োলজি ও কেমিস্ট্রির ফলে সৃষ্ট একটি সমস্যা। তবে ঠিক কী কারণে অটিজম হয় এ ব্যাপারে এখনো কোনো সুস্পষ্ট কারণ জানা যায়নি। সারা পৃথিবীতেই এই সমস্যার কারণ জানতে গবেষণা চলছে।

বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করে থাকেন জিনগত ত্রুটির কারণে অটিজম হতে পারে। যেমন কোনো পরিবারে যদি অটিজমের ইতিহাস থাকে তাহলে সেই পরিবারের শিশুটির অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা বেশি।

এছাড়া অটিজমের জন্য আরো কিছু বিষয়কে সন্দেহ করা হয়, এগুলো হচ্ছে গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস, বাচ্চার অন্ত্রের পরিবর্তনগত সমস্যা, মার্কারির (পারদ) বিষক্রিয়া, বাচ্চার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ পরিপাক করতে না পারা, টীকার প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।

চিকিৎসকদের বক্তব্য, অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণগুলো বাবা-মায়েরা সচেতন থাকলে চিহ্নিত করতে পারবেন। যেমন: ১২ মাস বয়সের মধ্যে মুখে আধো বোল না ফুটলে, পছন্দের কোনো জিনিসের দিকে শিশু ইশারা না করলে, ১৬ মাসের মধ্যে একটিও পূর্ণ শব্দ বলতে না পারলে, ২৪ মাস বয়সের মধ্যে অন্তত দুটি শব্দ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারলে, ভাষার ব্যবহার রপ্ত করার পর আবার ভুলে গেলে এবং বয়সের উপযোগী সামাজিক আচরণ করতে ব্যর্থ হলে অটিজমের সমস্যা আছে বলে ধরে নেওয়া যায়।

শিশুর অটিজম শনাক্ত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করতে হবে। যেমন: একই আচরণ বারবার করা, চোখে চোখ না রেখে তাকানো, আনন্দের বিষয়ে আনন্দ না পাওয়া বা নির্বিকার থাকা, পছন্দের বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা না বলা, পরিবেশ অনুযায়ী মুখভঙ্গির পরিবর্তন না করা, সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে না পারা ইত্যাদি। সাধারণত তিন বছর বয়সের দিকে এ লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশে প্রতি ৫০০ জনে একজনকে অটিস্টিক শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে ২.৫ লাখ শিশু অটিস্টিক। ভারতেও ৫০০ জনে একজন, আমেরিকায় প্রতি ১০,০০০ জন শিশুর মধ্যে ৪.৫ জন শিশু অটিস্টিক।

চিকিৎসা: বাচ্চা অটিস্টিক কিনা তা যাচাই এর জন্য কোনো প্যাথলজিক্যাল টেস্ট নেই। তবে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বাচ্চার আচরণ, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি বিবেচনা করে বাচ্চা অটিস্টিক কিনা তা বলতে পারেন। অটিজম এমন একটি কন্ডিশন যা কখনো পুরোপুরি ভালো হবার নয়। এটাকে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হয়। দ্রুত নির্ণয় করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় ভাল ফল পাওয়া যায়।

অটিজম প্রতিরোধে কিছু উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বাংলাদেশ জাতীয় অটিজম উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান। তার উদ্যোগে সরকারি পর্যায়ে অটিজম নিয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে মিরপুরে চালু হয়েছে ‘অটিজম রিসোর্স সেন্টার’। আর অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, অটিস্টিক শিশুদের অবস্থা পরিমাপসহ আরো অন্যান্য প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠন করা হয়েছে ‘সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেন’।

অটিজম বিষয়ে পরামর্শ পাবেন যেখানে : বর্তমানে বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে প্রচুর কাজ হচ্ছে। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু সংস্থা। ‘অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ এদের মধ্যে অন্যতম।

ঢাকার শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশুবিকাশ কেন্দ্রে অটিজম বিষয়ের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকায় ডা. রওনক হাফিজ, ডা. লিডি হক ও ডা. মল্লিক এবং চট্টগ্রামে ডা. বাসনা মুহুরী অটিজম নিয়ে কাজ করছেন। ঢাকায় অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, এসডব্লিউএসি (সোয়াক), কেয়ারিং গ্লোরি, বিউটিফুল মাইন্ডসহ এ রকম বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করছে।

আয়োজন : দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় স্নায়ুবিক প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্তদের অংশ গ্রহণে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। সভায় সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

শাহ মতিন টিপু/রাইজিংবিডিডটকম,ড্স্কে।

Leave a Reply