Home / প্রচ্ছদ / খাসা হাতের কাঁচা নির্মাণ ‘অগ্নি ২’…

খাসা হাতের কাঁচা নির্মাণ ‘অগ্নি ২’…

20-7-2015   -  30- 1নানা কারণেই মুক্তির আগে থেকেই আলোচিত ছিল ইফতেকার চৌধুরির ছবি ‘অগ্নি ২’। প্রথম কারণ ছিল ছবিটি তুমুল দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া ‘অগ্নি’র সিক্যুয়াল এটি। দ্বিতীয়ত বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম সিনেমা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া’র ছবি। তৃতীয়ত, এই ছবিটি একটি ‘বিগ বাজেট’ প্রকল্প। চতুর্থ কারণ ছবিটি বাংলাদেশে-ভারতের যৌথ প্রয়াস; দুই দেশের নামীদামি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয় করেছেন ছবিটিতে। পঞ্চম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে ‘অগ্নি ২’-এর প্রচারণা; বিশেষ করে ছবিতে অভিনেত্রী মাহিয়া মাহির ‘ম্যাজিক মামনি’ নামের আইটেম গানটির বদৌলতে আগে থেকেই ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহের একটা জায়গা তৈরি হয়েছিল। এরকম আরো বহু কারণেই এবারের ঈদে সেরা আকর্ষণই ছিল জনপ্রিয় নির্মাতা ইফতেকার চৌধুরির ছবি ‘অগ্নি ২’।

 কিন্তু সব মিলিয়ে ছবিটি যেমন হওয়া উচিত ছিল, যে আশা ব্যঞ্জনার সঞ্চারণ তৈরি করেছিল তার সিকিভাগও ছবিতে দেখাতে পারেননি নির্মাতা ইফতেকার চৌধুরি। ‘অগ্নি’র সাথে তুলনা করলে ‘অগ্নি ২’ নির্মাতার কাচা হাতের নির্মাণ। প্রশ্ন এসে যায়, তাহলে ‘অগ্নি’ ছবিটিতে ইফতেকার চৌধুরি কি সামর্থের চেয়ে বেশী দিয়ে দিয়েছিলেন! নাকি ‘অগ্নি ২’ নির্মাণে মনযোগ কম ছিল নির্মাতার?

 20-7-2015   -  30- 4বলা যায়, ইফতেকার চৌধুরির ‘অগ্নি’ যারা দেখেছেন, ‘অগ্নি ২’ সিনেমার বেশীর ভাগ দর্শকও তারাই। অগ্নি’র লোভেই তারা ‘অগ্নি ২’ দেখতে আসছেন সিনেমা হলে; কিন্তু আসছেন, দেখছেন এবং হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তবে সবাই যে হতাশ, তা কিন্তু না। কারো কারো ভাল লাগতে পারে। আমার লাগেনি, কারণ আমি অগ্নির দর্শক। আর অগ্নির দর্শক হিসেবে এর সিক্যুয়াল ‘অগ্নি ২’-কে নিতে পারেনি। ছবিটি অপরিপক্কতার দোষে দুষ্ট বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে গল্প বয়ানের দিক থেকে!

সবাই ভেবেছিল ‘অগ্নি’র যে বিধ্বংসী রূপ ইফতেকার চৌধুরি দেখিয়েছেন, এবারো হয়তো আরো বিধ্বংসীরূপে দেখা যাবে। হ্যাঁ, অগ্নিকে আরো বিধ্বংসীরূপেই দেখা গেছে ছবিতে, কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই, অযৌক্তিকভাবে সে বিধ্বংসী! আদ্যেপান্ত ছবির গল্প বিরক্তিতে ঠাসা, তারচেয়ে বড় বিষয় কাহিনী বর্ণনায় নেই কোনো ধারাবাহিকতা। প্রকৃতপক্ষে ছবিতে কোনো গল্পই নেই আসলে। ছবির শুরু দেখে মনে হয়েছিল, বাহ্, আরো একটি অসাধারণ ‘অগ্নি পর্ব’ দেখতে শুরু করেছি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা ভেস্তে যায়। কাহিনী প্রসঙ্গে ‘অগ্নি’র প্রথম সিক্যুয়ালে থাকা প্রেমিক শিশিরকে খুন করে ‘গোল্ডেন ট্রাইঅ্যাঙ্গেল’-এর সন্ত্রাসীরা। আর তাদের ধরতেই থাইল্যান্ডে যায় অগ্নি। সেখানে পরিচয় হয় মস্ত হ্যাকার ঈশানের সাথে। ধীরে ধীরে ঋদ্ধতা থেকে প্রেম, আর তার সাহায্যে অন্যদিকে অগ্নির একের পর এক খুন। এই ছবির গল্প, আবার গল্পের শেষে ‘টুইস্ট’ও আছে! গল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে টুইস্ট নিয়ে ভাবলে যা হয় আরকি। ‘অগ্নি ২’-এর ক্ষেত্রেও তেমনটিই হল। ছবিতে এক ধরণের টু্ইস্ট রাখার চেষ্টা করেছেন ইফতেকার। তিনি ভেবেছিলেন, শেষ সময়ে এসে দর্শককে ‘চমকে’ দিবেন তিনি। কিন্তু দর্শক কি আর সেই বোকাটি এখন আর আছে! গল্পের অসামঞ্জস্যতার ফলে খুব চমক সৃষ্টি করতে পারেনি ‘টুইস্ট’টি।

20-7-2015   -  30- 3‘অগ্নি’র গল্পের সাথে ‘অগ্নি ২’-এর গল্পের রয়েছে আকাশ পাতাল ব্যবধান। প্রথম সিক্যুয়ালে যে অগ্নির গল্প দেখি, সেই অগ্নি ছিল নির্যাতিত। তার পুরো পরিবারসহ কাছের মানুষেরা অপরাধীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছিল তার চোখের সামনে, ফলে অগ্নির প্রতিশোধ পরায়ন হওয়াটা বা সমানে অপরাধীদের ভিতর ঢুকে নিজের মানুষের রক্তের প্রতিশোধ নেয়াটা খুব একটা বেমানান ছিল না। কিন্তু ‘অগ্নি ২’-এ হুটহাট খুনোখুনি, সন্ত্রাসীদের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া খাপ ছাড়া মনে হয়েছে। তাছাড়া ছবিতে নেই কোনো থ্রিল বা অ্যাডভাঞ্চারও! যতোটুকু আছে তা আরোপিত মনে হয়েছে।

অপরাধীদের এখানে কোনো কার্যক্রমই নেই, নেই তাদের নৃশংসতাও। বলা যায় বিনা কারণেই অগ্নির হাতে সমানে খুন হয়েছেন তারা। তাই দেখা যায়, অগ্নি যখন অপরাধীদের ধাওয়া করেছে, মারছে তখন দর্শকরা নির্বিকার। দর্শকদের মোটেও কোনো ভাবান্তর নেই এই বিষয়ে। অথচ অপরাধীদের এমন নিষ্ঠুরভাবে দেখানো দরকার ছিল, যাতে অগ্নি তাদের ধাওয়া করলে দর্শকরাও সিনেমা হলের সিটে বসে বলে উঠে ‘ধর শালারে’ কিংবা ‘মার শালারে’; এমনটা কিন্তু এই ছবিতে মোটেও শোনা যায়নি। এমনকি একেবারে ছবির শেষে পাইথন নামের যে সবচেয়ে বড় অপরাধী তাকে মারার সময়ও দর্শকদের মধ্যে কোনো তৃপ্তি ছিল না। কারণ পাইথনকে এভাবে নৃশংসভাবে মেরে ফেলার মত কোনো কার্যকারণ তার মধ্যে দেখানো হয়নি। এই হিসেবে ‘অগ্নি ২’কে বলা যেতে পারে ‘লঘু পাপে গুরুদণ্ড’ দেয়ার এক ছবি।20-7-2015   -  30- 5

গল্পের ধারবাহিকতার দিকে নির্মাতা খেয়াল না রাখলেও, অভিনেত্রী মাহিয়া মাহি এবং কলকাতার নায়ক ওমের অভিনয়ের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন, এটা বোঝা যায় তাদের পরিপক্ক অভিনয় দেখে। ছবিতে মাহিয়া মাহির অভিনয় তার ক্যারিয়ার সেরাও বলা যায়। বিশেষ করে সে যখন অ্যাকশান দৃশ্যে! পুরো ছবিতেই ওম এবং মাহির অভিনয় ছিল অসাধারণ। এছাড়া ছবিতে বেশ নামীদামি অভিনয় শিল্পীরা থাকলেও তাদের অভিনয় বিশেষভাবে মোহিত করেনি। ভারতের চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা আশিষ বিদ্যার্থিকেও খুব একটা অভিনয়ে ব্যবহার করতে পারেননি ইফতেকার চেধৈুরি। থাইল্যান্ডে ইন্টারপুল অফিসার হিসেবে ছিলেন পুরনো অভিনেতা অমিত হাসান। দেখতে শুনতে এই চরিত্রের জন্য অমিত হাসানকে বেশ মানিয়ে গেলেও পরেরটুকু আর ঠিক নেই। প্রথমেই দেখা যায়, থাইল্যান্ডের পুলিশ অফিসারদের সাথে তিনি ইংরেজিতে পরিচিত হচ্ছেন, তারপরই বাংলা বলা শুরু করে দেন। এবং শুধু তাই না, কখনো কখনো থাইল্যান্ডের পুলিশ অফিসারদেরও দেখা যায় ভাঙা গলায় বাংলা বলছেন, এইগুলো যথেষ্ট হাস্য উপাদানে ভরপুর।

দর্শকদের মুগ্ধ করেছে ওম ও মাহি জুটির অভিনয়…

20-7-2015   -  30- 2এই সিনেমার পজিটিভ দিক হচ্ছে ছবির গান এবং অ্যাকশন দৃশ্য। গানের দৃশ্যগুলো অসাধরাণ। বারের মধ্যে একদল ছেলে-মেয়ে একসাথে নাচছে, এটা হিন্দি সিনেমায় দেখা গেলেও বাংলাদেশের বাংলা সিনেমায় খুব একটা দেখা যায়নি, এটা বিরলই বলা চলে। ফলে দেখা যায় ‘অগ্নি ২’ দেখতে আসা নির্বিকার কিছু দর্শক গান দুটি পরিবেশনার সময় আহ্লাদিত হয়েছেন, সিটি বাজাচ্ছেন। বারের মধ্যে ‘আইটেম’ গানের মত করে যে দুটি গান দর্শক দেখে, তার কোরিওগ্রাফিও ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে ওমের ‘একখান চুমু’ এবং মাহিয়া মাহির ‘ম্যাজিক মামনি’ অসাধারণ। এই দুটি গানতো বেশ কিছুদিন ধরেই ইউটিউবে বেশ ঝড় তুলেছে, বিশেষ করে মাহির আইটেম গান ‘ম্যাজিক মামনি’ ইউটিউবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার দেখা কোনো ভিডিও গানের কীর্তি গড়েছে। এছাড়াও পুরো ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও খুব ভালো হয়নি। কোনো অ্যাকশন দৃশ্যের বিশেষ উত্তেজনা মুহূর্তে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুনে মনে হয়েছে, আরে, এটাতো হিন্দি ‘ধুম’ সিনেমার অতি পরিচিত মিউজিক! খুব খেয়াল করে কান পেতে শোনার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিককে আলাদা করা গেল না। বারবার মনে হলো, এটা ধুম ছবিরই অ্যাক্সটেনসান; কিংবা ধুম ছবির মিউজিকটাকেই একটু ভ্যারিয়েশন করা। একটু এদিক-সেদিক, এই আরকি! তবে নাও হতে পারে। এই ছবির পোস্টার ছাড়া আর কিছুই এখন পর্যন্ত নকলের অভিযোগ শোনা যায়নি!

-বাংলামেইল২৪ডটকম অনলাইনডেস্ক।

%d bloggers like this: