সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২, ১০:৫০ অপরাহ্ন

চিত্র সমালোচনা : আয়নাবাজির দারুণ বাজি

aynabazi

আয়নাবাজির মুক্তি আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইতোপূর্বে আমাদের দেশে একাধিক ছোটবাক্সের নির্মাতা ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা ছবি করেছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকি ছাড়া আমাদের চলচ্চিত্রে নিজস্বতার স্বাক্ষর রাখতে প্রায় সবাই নিদারূণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতার কারণ ও দায় নিয়ে ভিন্ন মত ও আলোচনার সুযোগ রয়ে গেলো। কিন্তু ব্যর্থতার সব গল্পই ভুলে যাই টিকেট কাউন্টারে গিয়ে। ছবি মুক্তির দু’সপ্তাহ পেরিয়ে হলে টিকেট পাওয়া যায় না এমন দৃশ্য বাংলাদেশে বহুকাল বিরল ছিলো। আয়নাবাজি দর্শক টেনেছে, বাংলাদেশের মুমূর্ষু হলগুলোয় আবার দর্শক ভিড় করেছে এ অনেক বড় সাফল্য।

সোস্যাল নেটওয়ার্কে কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন- ছবিটি নকল। সম্ভবত কোরিয়ান চলচ্চিত্র তাম্বলউইড (পরিচালক, চিত্রনাট্যকার : লি ডুক-হে, মুক্তি ২৮ নভেম্বর ২০১৩)-এর সঙ্গে তুলনা করেই এ কথা তুলেছেন তারা। আয়নাবাজির নায়ক শরাফত করিম আয়না ও তাম্বলউইডের নায়ক চ্যাং-স্যু উভয়েই বদলী আসামী হিসেবে জেল খাটে এবং উভয়ের জীবনেই একজন নারী বড় প্রভাব রাখে। ঘটনার এইটুকু মিল রয়েছে; এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু এটুকু মিলের কারণেই একটি ছবির বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনা উচিত নয়। বিশ্ব শিল্প-সাহিত্যে এমন মিলের কোনো অভাব নেই। বলা দরকার, স্বয়ং শেক্সপিয়রের ৩৬টি নাটকের একটি কাহিনীও মৌলিক নয়। আসলে শিল্প-সাহিত্যে কি বলছির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেন বলছি, কীভাবে বলছি। শিল্পকলায় যতগুলো মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু বিষয়ের বা কাহিনীর জন্য নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি ও গল্প বলার কৌশলের উপরই নির্মিত হয়েছে। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে আয়নাবাজি অনেকটাই ফিল্ম নয়্যার ভঙ্গিতে তৈরি।

উল্লেখ করা দরকার, স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে শ্রেণী ও ঘরাণার বিবেচনায় খুব বেশি বৈচিত্রধর্মী চলচ্চিত্র তৈরি হয়নি। লোককাহিনী, মুক্তিযুদ্ধ, শিশুতোষ, প্রেমের গল্প, পারিবারিক-সামাজিক গল্প ইত্যাদির বাইরে আমরা চলচ্চিত্রকে নিতে পারিনি। বাস্তবতা হলো, এখনও এদেশে একটি কল্পবিজ্ঞান কিংবা ভৌতিক কাহিনী চিত্রায়নের কথা আমরা ভাবতে পারি না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বেদের মেয়ে জোসনা কিংবা মনপুরার মতো সিনেমা ব্যবসায়িক সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছে। হয়তো আয়নাবাজি এদের বাণিজ্যিক রেকর্ড ছুঁয়ে যাবে বা অতিক্রম করবে। কিন্তু তার চেয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আয়নাবাজি উল্লেখিত চলচ্চিত্র বা অন্য চলচ্চিত্রগুলো থেকে অন্তত বিষয় আর ভঙ্গিতে নতুন। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এমন সিনেমার নজির অসংখ্য আছে, কিন্তু বাংলাদেশের সিনেমায় ক্রাইম-থ্রিলার ও ফিল্ম-নয়্যার একেবারেই নতুন। আশার কথা, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী যারা চলচ্চিত্র দর্শকের একটি বড় অংশ তারা এ ছবি গ্রহণ করেছে। অন্তত প্রবাহমান বক্স অফিসের হিসাব তাই বলে।

সম্পূর্ণ নতুন ধরণের একটি গল্প বলার জন্য আয়নাবাজি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আলোচিত হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি চিত্রনাট্যকার গল্প বলার ভঙ্গিটিকে কাজে লাগাতে পারেননি। প্রথমত শরাফত করিম আয়না যে কি-না খুব সহজেই মানুষের চরিত্র আয়ত্ব করতে পারে, সে একাধিক মানুষের হয়ে জেল খাটে। এটা তার পেশা। শুধু পেশা নয়, প্যাশনও বলা যায়। কেননা সে পুরো ব্যাপারটি উপভোগ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক রাজনীতিকের হয়ে জেল খাটতে গিয়ে শুরু হয় বিপত্তি। তা এমন টনটনে একটি গল্পকে চিত্রনাট্যকার খুব সরল রেখায় সাজিয়েছেন। এই গল্পটি নন-লিনিয়ার ভঙ্গিতে বললে আরো জমতো বলেই বিশ্বাস করি। দর্শককে চাইলেই যে গল্প নিয়ে খেলানো যেতো সে গল্পটি চিত্রনাট্যকার একদম ‘তারপরে তে কি হইলো’ ছকে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়েছেন। যেখানে প্রথম আসামী বদল হলো প্রিজন ভ্যান আর গাড়ি থেকে; দুই চরিত্র বেরিয়ে একে অপরের জায়গায় চলে গেলো; সেখান থেকেই চলচ্চিত্রটি শুরু হলে দর্শক কাহিনী বিশ্লেষণ ও আবিষ্কারের সুযোগ পেতেন। একটি চলচ্চিত্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুহূর্ত তৈরি করা। কোন কোন মুহূর্তে দর্শক কাঁদবে, কোন মুহূর্তে হাসবে, কখনো বিস্মিত, হতবিহ্বল হয়ে উঠবে। আয়নাবাজির গল্পে এইসব মুহূর্ত সৃষ্টির অনেক সুযোগ ছিলো। চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ নির্মাতা যৌথভাবে সেই সব মুহূর্তকে ধরতে পারেননি সদা।

আয়না একদল শিশুকে নিয়ে রিহার্সেল করে। রিহার্সেল শুরুর আগে সে শিশুদের মেডিটেশন করায়। কল্পনার রাজ্যে শিশুদের ঘুরিয়ে আনে সমুদ্রে। এই অংশটিতে খুবই সুযোগ ছিলো মুহূর্ত সৃষ্টির। তার আগেই দৃশ্যটি শেষ হয়ে গেলো। আফসোস, বাংলা চলচ্চিত্রে একটি অসাধারণ মুহূর্ত সৃষ্টির সুযোগ হারালেন পরিচালক।

আমার কাছে এই ছবির অন্যতম দুর্বলতা- বর্ণনা অংশ। শরাফত করিম আয়নার মুখে বর্ণনাটা না-দিলেও হতো। একবার বর্ণনাগুলো বাদ দিয়ে ভাবুন, দেখবেন ছবিটা দেখতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বরং অনেক কিছু দর্শক নিজেই তৈরি করে নেবে। আয়নার মুখে নিজের সম্পর্কে বলা গল্পের আকর্ষণীয়তা কিছুটা হলেও ক্ষুন্ন করেছে। আসলে মূল গল্পটি এতো জোড়ালো যে সে তুলনায় চিত্রনাট্যে বাঁক ও ধার অনেক কম মনে হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গল্প সংকটের এই আকালে আয়নাবাজি একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে।

নায়ক-নায়িকার সাক্ষাতটি কিন্তু তুলনায় বেশ আকর্ষণীয়। মজার ও মধুর। বই পড়ে যাবে, তুলতে গিয়ে মাথায় মাথায় ঠোক্কর খাবে- এইসব ক্লিশে ব্যাপার পার হওয়া গেলো এই চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকার প্রথম সাক্ষাতটিতে। এই সুযোগে একটু চরিত্রায়ন ও অভিনয়ের কথা বলা যাক। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য চঞ্চল চৌধুরী স্বয়ং। তার অসাধারণ অভিনয় দেখতে দেখতে বারবার আপ্লুত হচ্ছিলাম আর প্রতিবারই আমাদের কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর কথা মনে পড়ছিলো। পর্দায় এককথায় চঞ্চল যাদু আর মায়া সৃষ্টি করেছেন। তাকে কেন্দ্র করে পুরো ছবিটি দাঁড়িয়ে আছে। চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় ও চরিত্রায়ণ নিয়ে আলাদা করে লেখার আগ্রহ রইলো। শুধু সংক্ষেপে বলি, চরিত্রায়ণের প্রয়োজনে তিনি কপালের ভাঁজ পর্যন্ত আয়ত্ব করেছেন।

অন্যত্র, এই ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা নাবিলা। নাবিলা পূর্ণাঙ্গরূপে ব্যর্থ। তার অভিনয়ের দুর্বলতা ছবির অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আর দৃশ্য নষ্ট করেছে। এমনকি তিনি হাঁটাও আয়ত্ব করতে পারেননি। কাঁচাবাজারে তার জড়তা বিরক্তিকর। আমার মতে, কাঠ পুত্তুলিকার চেয়ে কিছুটা উত্তম তার অভিব্যক্তি। সাবের হোসেন চরিত্রে পার্থ উতরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইতোপূর্বে ছোট পর্দায় যতোটুকু দেখেছি তাকে ভালো অভিনেতাই বলা যায়। তুলনায় ক্রাইম রিপোর্টার সাবের হোসেনের চরিত্রটি বিস্তৃতি পায়নি। তার পর্দা উপস্থিতি যথেষ্ট সময়কাল ধরেই ছিলো। কিন্তু চরিত্রের বিস্তার ঘটেনি। চিত্রনাট্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটিতে মনোযোগ কম দিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি চরিত্রই ভীষণভাবে ভাসমান, এলিয়েন। চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আরো কাজ করার সুযোগ ছিলো। নায়িকার পারিবারিক অবস্থান সুস্পষ্ট নয়। তার বাবা কী করে, কীভাবে চলে পরিবারটি এইসব শ্রেণীগত ও সামাজিক সমস্যা রয়েই যায়। তুলনায় খুবই অল্প সময়ের উপস্থিতি নিয়েও অভিনয় দিয়েই খায়রুল বাসার লাড্ডু দর্শককে মুগ্ধ করেছে। চরিত্রের ডিটেইল নিয়ে আরো কাজ করা যেতো। তবে পরিচালকের দিক থেকে কাস্টিং ভাল। এক নাবিলা ছাড়া প্রত্যেকেই উতরে গেছেন। গাউসুল শাওনের কাছে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরেই জানি তিনি অল্পের মধ্যে অনেক দিতে পারেন। জানেন চরিত্রায়নের গভীরতা। কিন্তু এই সিনেমায় তিনি কিছুটা হলেও অতি অভিনয় করেছেন।

জেলখানার অংশে আরো কিছু আসামীকে তুলে ধরা যেতো। জেলের যে অন্ধকার দিক সেটা ছবিতে কমই এসেছে। যদিও গল্পটার বড় অংশজুড়ে জেলখানা আছে। জেলখানার দৃশ্যগুলো সত্যিই নিখুঁত। শিল্প নির্দেশক দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। জেলখানায় চিত্রায়িত চিরকুটের গানটি যথার্থই অসাধারণ। এই গানটি বাংলা চলচ্চিত্রে থিমেটিক পিকচারাইজেশনের নতুন সংযোজন। তবে কাওয়ালিতে হাতের তালির সঙ্গে ঢোলের বাড়ি মেলে না। শুরুটা ধীর হলেও ক্রমশ গল্পটা এগিয়েছে দ্রুততার দিকে। বাংলা ছবির প্রচলিত, মুখস্থ সংলাপের বাইরে সংলাপ শুনতে ভালো লেগেছে। সংলাপ অনেকক্ষেত্রেই গল্প এগিয়ে দিয়েছে। সংলাপে আবেগ ও গতিময়তা লক্ষ্যণীয়। কাঁচাবাজারে নায়িকার মুখে ‘কতো করে দাম’ – টাইপের সংলাপ অবশ্য দুর্বল ঠেকেছে।

আরেকটি ভালো দিক, আসলে দারূণ ভালো এই সিনেমার দৃশ্যায়ন। সিনেমাটোগ্রাফি অসম্ভব শক্তিশালী। প্রত্যেকটা টপ শট সুন্দর। ছবিতে ঢাকার চিত্র উঠে এসেছে দারুণভাবে। বুড়িগঙ্গা যতো না সুন্দর তারচেয়ে বেশি সুন্দর রাশেদ জামানের ক্যামেরায়। চলচ্চিত্রের দুটো দিক আছে, শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক। টাকা ছাড়া যেমন সিনেমা হয় না, তেমনি শিল্প ছাড়াও সিনেমা হয় না। দুইয়ের মিলনের স্বার্থক ব্যবহারেই জন্ম হয় সফল চলচ্চিত্রের। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সফল চলচ্চিত্রের সংখ্যা কম। অনেক বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবিই শিল্প সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি শৈল্পিক অনেক ছবিই বাণিজ্যিকভাবে ধ্বসে পড়েছে। সেই বিবেচনায় আয়নাবাজি আশার আলো দেখায়। সফল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সমীকরণ অনুযায়ী গান, যৌনতা, কমেডি, প্রেম, রোমান্স, বেদনা ইত্যাদি সবই ছিলো এ ছবিতে। অন্যদিকে সম্পাদনা, চিত্রায়ন, অভিনয় এবং সর্ব্বোপরি পরিচালনার শৈল্পিক দক্ষতাও আছে। পরিচালক অমিতাভ রেজা তার প্রথম ছবিতেই দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। আয়নাবাজি’র সাফল্য আমাদের উৎসাহ দিক, নতুন ঘরাণার, নতুন ধারার আরো আরো সফল ছবি সৃষ্টি হোক। জয়তু আয়নাবাজি, জয়তু বাংলা সিনেমা।

সূত্র:risingbd.com,ডেস্ক।

https://www.facebook.com/coxviewnews

Design BY Hostitbd.Com