শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

ধর্ষণ

-: সীমা চন্দ্র নম :-

দারিদ্রতা মানুষের জীবনকে এমনভাবে তাড়িত করে তখন দারিদ্রতার বিষাক্ত ছোবলে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনে সুন্দর করে বেঁচে থাকার জন্য দুটি অন্ন, শিক্ষা নিত্যদিন যেন আকাশ-পাতাল ব্যবধান। স্নিগ্ধার জীবনটাও তেমনি। তার বাবা একজন ফেরিওয়ালা দিনে আনে দিনে খায়, অনেক সময় নুন আনতে পানতা ফুরায়। এমন অবস্থা হয় চার ছেলে-মেয়েসহ ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরিবার। স্নিগ্ধার বাবা জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার চালাতে বড়ই হিমশিম খাচ্ছে। একবেলা অন্ন জুটলে অন্ন বেলা জোটা খুব কঠিন। তার উপর কয়েকদিন ধরে স্নিগ্ধার বাবা অসুস্থতা সিগ্ধাকে নাড়া দেয়। স্নিগ্ধার মা সংসার চালাতে অন্যের ঘরে আয়া হতে বাধ্য হয়। তবুও সংসারে প্রতিনিয়ত অভাব তাড়িত করে। মাত্র ৮ বছর বয়সী স্নিগ্ধা বস্তা নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা বোতল, ছেড়া জুতো, গ্যরেজে পড়ে থাকা ছোট লোহার টুকরো বস্তা ভরে নিয়ে আসে বাড়িতে। দশ-পনের দিন এক সাথে সব জমা করে লোহার দোকানে বিক্রি করে দেয়।

স্নিগ্ধা প্রতিদিন ভোরে অন্যান্য টোকাইদের সাথে গিয়ে এসব ভাঙা জিনিসপত্র বস্তায় করে নিয়ে আসে। যে বয়সে পৃথিবীর কুলে হেসে খেলে সুন্দর করে বেঁচে থাকার কথা সে বয়সে বিশাল কর্মের ডালা। “গরিবের কান্না সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে।” এখনো এই ধরাতে স্নিগ্ধার মত শিশুর অন্যের মুখে অন্ন জোগানোর সময হয়নি তবুও বিশাল দায়িত্ব নিতে হল। স্নিগ্ধার বড় ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে দুরে থাকে বিয়ের পর প্রায় ছেলেদের নিয়মটাই যেন এমন বউয়ের কথায় উঠে-বসে। এদিকে স্নিগ্ধার বড় বোন শিমলার বিয়ের কথা হচ্ছে। স্নিগ্ধার বাবা শিমলাকে কি করে বিয়ে দেবে সে নিয়ে বড় টেনশনে আছে। শিমলার মা কাজ করে কয়েকটা টাকা জমানো আছে। সে টাকা দিয়ে কি আর শিমলার বিয়ে দেওয়া যাবে। বিয়ের সব কথা পাকা হয়ে গেছে। মাটির ব্যাংকে স্নিগ্ধার কিছু টাকা জমানো আছে। সেটা ভেঙে দেখে সেখানে অনেক টাকা হয়েছে স্নিগ্ধার। স্নিগ্ধার মা যেন রাই কুড়িয়ে বেল পেল, মেয়ের সঞ্চয় দেখে আহলদে আটখানা হয়ে গেল। দু- সপ্তাহ পর স্নিগ্ধার বোনের বিয়ে হল। শিমলার স্বামী কানন এর বড় কাপড়ের ব্যবসা আছে, দুই ভাই-বোন কানন ছোট, বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, কানন যখন ২ বছর তখন কাননের  মা মারা যায়, বাবার হাতে দুই ভাই-বোন বড় হয় কখনো মাতৃত্বের অভাব বুঝতে দেয় নি। স্নিগ্ধার মা শিমলাকে কোনো মতে বিয়ে দিয়ে যেন কুল ফিরে পেল। মেয়ের বিয়ের পর আর্থিক দৈন্যতা আরো বেড়ে গেল। স্নিগ্ধার বাবা সেরে উঠল অসুস্থতা থেকে। দু- এক দিন পর হয়তো কাজে বের হবে। তারপর আর কোনো অভাব থাকবে না। স্নিগ্ধার মা-বাবা স্নিগ্ধার প্রতি আলাদা ভালবাসা। এই শিশু বয়সে নিজের পিতার ঔষুধের টাকা জোগাড় করতে কতই না পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নরম হাত- পা গুলো কড়া পড়ার মত অবস্থা। স্নিগ্ধার মা-বাবা নিজেদের বড় অপরাধী মনে করে।  মাঝে মাঝে স্নিগ্ধাকে নিয়ে বড় ভয় হয়। আযান দেওয়ার সাথে সাথে বের হয়ে যায় স্নিগ্ধা যদিও তার মা-বাবা অনেকবার নিষেধ করেছে তবুও সে চুপি চুপি বের হয়ে যায়। এর জন্য তাকে অনেক বকা শুনতে হয় মার কাছ থেকে সেসব কথা স্নিগ্ধার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বের হয়ে যায়। আজ স্নিগ্ধা আযান দিয়েছে মনে করে চুপি চুপি বের হয়ে গেল। সে দেখতে পেল অন্যদিনের চেয়ে বেশি বোতল পড়ে আছে। রাস্তা একেবারে জনশূণ্য, মাঝে মাঝে কুকুরের হাক-ডাক শোনা যায়। আজকে কোনো টোকাই রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না কেন সেটা স্নিগ্ধা ভাবছে। বোতলগুলো কুড়িয়ে নিল রাস্তা থেকে গ্যারেজে গিয়ে ছোট ছোট লোহার টুকরো পড়ে রইল সেগুলো নিল। সে দেখতে পেল আনুমানিক ৩৫ বছর হবে এমন একটি যুবক লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার কাছে এসে বলল কি করছ খুকি? সে উত্তর দিল কাকু লোহা খুঁজতেছি। সেই যুবকটি স্নিগ্ধাকে বলল তুমি আমার সাথে আস খুকি আমার দোকানে অনেক ভাঙ্গা জিনিসপত্র আছে। তাই নাকি কাকু? হে, খুকি আস। সে ভাবল আজ যদি পুরো বস্তা ভর্তি করে নিয়ে যেতে পারি বাবা খুব খুশি হবে। সে রাজি হয়ে হাঁটতে থাকল সেই অচেনা লোকটির সাথে……. ।

অনেক রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর সে বলে উঠল আর কতদূর……….খুকি আর বেশিদূর নয়। তার মাথায় ভাবনা এল এখনো সকাল হচ্ছে না কেন মনে মনে ভাবতে লাগল তাহলে কি আমি আযান দেওয়ার আগে চলে এসেছি। কাকু এখন কয়টা বাজে? সাড়ে তিনটে, কি! সে চমকে উঠল ভয় পেয়ে গেল! আযান দিতে এখনো এক ঘন্টা বাকি সে কোথায় আসল রাস্তা চিনতে পারছি না বলে উঠল। আমি তোমাকে দিয়ে আসব খুকি তোমাদের বাড়িতে। কাকু আমি চলে যাব বাড়ি আমার ভাল লাগছে না। এইতো আমার দোকান চাবি দিয়ে লোকটি দোকান খুলল দোকানের ভিতর ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেমন একটা পঁচা দুগন্ধ বের হচ্ছে দোকান থেকে লাইট জ্বালিয়ে দিল। সিগ্ধা বলল এখানে বোতল কোথায়? ভিতরের রুমে আছে। তুমি ঢুক আমি আসছি। স্নিগ্ধা ভিতরে ঢুকে দেখল পেল মেয়েদের ভাঙ্গা চুড়ি, ওড়না, জুতো, ও মেয়েদের ব্যাগ কোনো বোতল বা কিছুই দেখতে পেল না। এখানে মৃত মানুষের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। দেওয়ালে রক্তের দাগও দেখা যাচ্ছে সে ভয় পেয়ে বের হয়ে গেল। কাকু তালা দিয়ে দিলেন যে কি করে বের হব কাকু বাইরে। সে কাঁদতে লাগল তার হাত টেনে মুখ বেধে ফেলল যাতে চিৎকার করতে না পারে স্নিগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে নিজের লিপসা মেটাল। নোংরা অসভ্য লোকদের কাছে কে শিশু, কে যুবতী, কে বুড়ো কোনো কিছু আসে যায় না। এই সুন্দর ধরাতে স্নিগ্ধার মত অবুঝ শিশু পাষন্ড নরপশুদের চিনতে পারে না। রক্তে পুরো মেঝে লাল হয়ে গেছে। যেন কেই আনন্দে হোলি খেলল। নিজের স্বাধ মেটানোর পর তার হাত-পা, মুখের বাধন খলে দিল। সে আর নড়া চড়া করছে না, হয় তো আর কখনো করবে না এই যেন চিরনিদ্রা আর কখনো জাগ্রত হবে না। যদিও জাগ্রত হয় সারাজীবন এই ভূমন্ডলে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে, সমাজের কাছ থেকে শোনা যাবে ছি! ছি! ছি! এই শব্দটা। মনুষ্যত্বহীন লোকের কাছে স্নিগ্ধার চিৎকার, মিনতি কিছু আসে যায় না। মেঝেতে রক্তের দাগগুলো মুছে ফেলল কেউ বুঝতে পারবে না এখানে ক্ষনিক আগে রক্তের স্রোত বয়েছিল…….. আগে থেকে সে পটু কারণ এরকম অনেক নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যাই অভিজ্ঞ তাই সবকিছু মেনেজ করে নিতে পারে। লাশটা বস্তায় ভরে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে  …….।

স্নিগ্ধার মায়ের ঘুম ভাঙল তার কখন বের হল বুজতে পারেনি তার উপর রেগে আছে। বড় একটা বেত সুন্দর করে রেখেছে স্নিগ্ধাকে ধোলাই করার জন্য, এত বড় বেত আগে কখনো রাখেনি স্নিগ্ধাকে মারার জন্য। কিন্তু আজ দু-ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেল এখনো স্নিগ্ধা আসছে না ঘরে। তার বাবার ঘুম ভাঙার পর হঠাৎ যেন মনে হচ্ছে কি হারিয়ে ফেলেছে জীবন থেকে এমন মনে হচ্ছে আজ যেন নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। দু-তিনদিন উপবাস থেকেছে এতটা খারাপ লাগে নি, ব্যবসা করতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে এতটা ভেঙে পড়েনি। বুকটার ভিতর কেন চটপট করছে। যেন ধনসম্পদের চেয়ে মহা মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছে। তার মা সারা রাস্তাঘাট তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াল কোথাও দেখতে পেল না স্নিগ্ধাকে। সকল টোকাইদের কাছে স্নিগ্ধাকে দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করল কিন্তু সবাই না ছাড়া হ্যা কেউ বলল না। চারিদিকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না এমন এমন হৈ চৈ তার বাবার কানে আসল স্নিগ্ধার বাবা চমকে উঠল তার বাবা স্নিগ্ধাকে খুঁজতে বের হয়ে গেল। হঠাৎ করে দেখতে পেল তার মায়ের কোলে, পুরো শরীরে রক্ত। স্নিগ্ধার বাবা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল আর এগুতে পারছে না। কেন পারছে না চিৎকার করে কাঁদতে যেন হাটার শক্তি, কথা বলার শক্তি, কাঁদার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। স্নিগ্ধার মায়ের কান্না পুরো আকাশ বাতাশ চেয়ে গেছে, যেন এখন মেঘ হয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝড়বে বিরামহীনভাবে ………

https://www.facebook.com/coxviewnews

Design BY Hostitbd.Com