Home / প্রচ্ছদ / বঙ্গোপসাগরে জলদস্যূরা বেপরোয়া : প্রশাসনের নিরবতায় হতাশ জেলেরা

বঙ্গোপসাগরে জলদস্যূরা বেপরোয়া : প্রশাসনের নিরবতায় হতাশ জেলেরা

Dakat - Ajit Himu 04-01-2016 (news & 2pic) f1অজিত কুমার দাশ হিমু; কক্সভিউ:

বঙ্গোপসাগরে চলছে মাছ ধরার ভরা মৌসুম। এ বিশাল জলসীমায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে অন্তত ১৫টি জলদস্যু গ্রুপ। আর মৌসুমের শুরুতেই জলদস্যুতার কবলে পড়ছে জেলেরা। প্রতিনিয়ত জলদস্যূরা সাগরে মাছধরার ট্রলারে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটের পাশাপাশি মাঝিদের অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ও করছে। এতে জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতংক। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে জেলে ও ব্যবসায়ীরা রাজপথে মানবন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অব্যাহত রেখেছে। কোস্টগার্ড বলছে, নানা সংকট ও সমস্যার কথা। আর প্রশাসন রয়েছে সম্পূর্ণ নিরব।

জানা যায়, বাংলাদেশে মাছের চাহিদার সিংহভাগ যোগান আসে বঙ্গোপসাগর থেকে। হাজার হাজার নৌকা এবং ট্রলার বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় চষে বেড়ায় মাছের আশায়। আর এ কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে কয়েক লাখ জেলে। কিন্তু এসব জেলেরা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়ছে সাগরের জলদস্যু বাহিনী গুলোর কাছে। সাগর ও উপকূলে সক্রিয় রয়েছে এ ধরণের অন্তত ১৫টি গ্রুপকে শনাক্ত করেছে র‌্যাব এবং কোস্টগার্ড। শনাক্ত হলেও নানা সমস্যার কারণে জলদস্যু বাহিনী গুলোর বিরুদ্ধে সহজে ব্যবস্থা নিতে পারছেনা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

Fishing Boot - Ajit Himu 04-01-2016 (news & 2pic) f1সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন অংশে বোট ডাকাতি সহ শত শত মাঝি-মাল্লাকে অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করেছে এ চক্রের সদস্যরা। ফলে বঙ্গোপসাগরে মাছধরার বোটে অব্যাহত ডাকাতি রোধ ও ডাকাতদের গ্রেফতারের দাবীতে কক্সবাজার শহরের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে মৎস্য ব্যবসায়ীরা। রোববার সকাল ১১টায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে কক্সবাজার ফিশারী ঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেড ও হাঙ্গর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বঙ্গোপসাগরে মাছধরার বোটে দীর্ঘ দিন ধরে ডাকাতি করে আসছে চিহ্নিত দস্যুরা। এর ধারাবাহিকতায় বিগত এক মাসে ধরে অব্যাহত ভাবে ডাকাতি চালানো হয়েছে। এ সময়ে অন্তত ৩৫-৪০ তেকে বোট ডাকাতির শিকার হয়েছে। ডাকাতি এখনো ডাকাতি অব্যাহত রয়েছে। ডাকাতরা মাছ, জালসহ সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে জেলেদের উপর নির্মমভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। ডাকাতদের হামলায় বিগত এক মাসে অন্তত ১৫ জন জেলে মারাত্মক আহত হয়েছে। তাদেরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসাপাতাল ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’

তারা আরো বলেন, ‘বিগত সময়ে ডাকাতের হামলায় জেলেদের প্রাণহানি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে। এ কারণে বতর্মানে মৎস্য আহরণ থমকে গেছে। দুর্দিন যাচ্ছে জেলেদের। একই সাথে মৎস্য ব্যবসীয়দের ব্যবসাও চরম মন্দায় পতিত হয়েছে। এতে করে মৎস্যের সাথে জড়িত শ্রমিকরা না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।’

বক্তাদের অভিযোগ, ‘দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত ডাকাতি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জেলেদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কোস্টগার্ড নিরাপত্তা দেবে তো দূরের কথা উল্টো জেলেদের বিভিন্ন ভাবে চরম হয়রানি করে যাচ্ছে।’

তারা হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘ডাকাতদের অত্যাচারে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পেছনের যাওয়ার মতো আমাদের আর কোন জায়গা নেই। তাই আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সাগরে ডাকাতি রোধে ব্যবস্থা না নিলে রাজপথ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।’

অন্যদিকে জেলে ও ফিশিং ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, শীতের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ভরা মৌসুম এখন। আর শুরুতে মাছও ধরা পড়ছে প্রচুর। কিন্তু প্রতিদিন সাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে জলদস্যুর কবলে পড়তে হচ্ছে জেলেদের।

বিশেষ করে মহেশখালীর সোনাদিয়া থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্ট পর্যন্ত জলদস্যুরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বঙ্গোপসাগর। জেলেদের জালে হানা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে ফিশিং ট্রলার মালিকদের মধ্যে নেমে এসেছে চরম হতাশা।

বঙ্গোপসাগর দাপিয়ে বেড়ানো বিভিন্ন এলাকার এসব ডাকাতরা এখন সোনাদিয়াদ্বীপ সহ বিভিন্ন উপ-দ্বীপে জড়ো হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। এ কারণে জেলে ও ফিশিং বোট মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ অবস্থায় সাগরকে জেলেদের জন্য নিরাপদ করার দাবি জানিয়ে দ্রুত প্রশাসনকে সাগরে ও স্থলে যৌথ অভিযান চালানোর দাবী জানিয়েছেন কক্সবাজার ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান।

আর কক্সবাজারে দায়িত্বরত কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার নান্নু মিয়া জানালেন, জনবল ও নৌ-যান সংকটের মধ্যেও তারা যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালেও নানা সমস্যার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলেও কিছু কিছু জলদস্যূ গ্রুপকে সনাক্ত করতে পেরেছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে শনাক্ত করা এসব জলদস্যূ গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে র‌্যাব এবং কোস্টগার্ড।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৎস্য আহরণ মৌসুম হওয়ায় জেলার সকল ফিশিং বোট বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে চলে যায়। জেলেরা সাগরে চলে যাওয়ার সাথে সাথে সোনাদিয়া সহ বিভিন্ন উপদ্বীপে অবস্থানকারী দুর্ধর্ষ জলদস্যূ নাগু মেম্বারের পুত্র নকিব বাহিনী, দস্যূ সম্রাট জাম্বু বাহিনী, সরওয়ার বতইল্যা বাহিনীর আশ্রয়ে মাতারবাড়ী, কুতুবদিয়া, হাটখালী, বদরখালী, চকরিয়া, মগনামা, পেকুয়া বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কুখ্যাত জলদস্যূরা সোনাদিয়ায় জড়ো হতে থাকে। মহেশখালীর সোনাদিয়াদ্বীপের উপকূল মাছ ধরার প্রধান রুট বঙ্গোপসাগরের মোহনা হওয়ায় নির্বিঘ্নে ডাকাতি চালাতে এসব জলদস্যূরা এখানে জড়ো হয়েছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন।

অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোট মালিক জানান, ওইসব জলদস্যূরা মুঠোফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দিচ্ছে বিভিন্ন ফিশিং বোট মালিকদের। টাকা না দিলে তাদের বোট লুট করা হবে, মাঝি মাল্ল­াদের হত্যার হুমকিও দিয়েছে।

কক্সবাজারের ছোট-বড় ফিশিং বোট রয়েছে সাড়ে ৪ হাজার। আর ৫ লাখ মানুষ মৎস্য আহরণ ও বিক্রিসহ নানা প্রক্রিয়ায় জড়িত।

%d bloggers like this: