Home / প্রচ্ছদ / মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন – সৈয়দ মোঃ রেজাউর রহমান এডভোকেট

মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন – সৈয়দ মোঃ রেজাউর রহমান এডভোকেট

Sayed Rezaur Rahaman - 2সৈয়দ মোঃ রেজাউর রহমান এডভোকেট

প্রভাষক – কক্সবাজার আইন কলেজ।

মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বাংলাদেশ জাতীয় জীবন মানবপাচার এক গুরুতর সমস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবপাচারের ফরে এর শিকার ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। তার জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন এবং মানবপাচার অপরাধের শিকার ব্যক্তিবর্গের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে বিধানকল্পে ২০১২ইং সনের ৩নং আইন যাহা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ নামে পরিচিত। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর ৩ ধারা মতে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বল প্রয়োগ করিয়া বা প্রতারণা বা উক্ত ব্যক্তির আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত বা অন্য কোন অসহায়ত্বকে কাজে লাগাইয়া বা অর্থ বা অন্য কোন সুবিধা লেনদেন পূর্বক উক্ত ব্যক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণ করিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে যৌন শোষণ বা নিপীড়ন বা শ্রম শোষণ বা অন্য কোন শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্যে বিক্রয় ক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর চালান বা আটক করা বা লুকাইয়া রাখা আশ্রয় দেওয়া। এই আইনের ১৬ ধারায় এই আইনের অধীন সকল অপরাধকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য এবং অ-আপোষযোগ্য করা হয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এ মোট ৪৮টি ধারা রয়েছে।

এই আইন ১৭ ধারায় অভিযোগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এই আইনের কোন অপরাধ সংগঠিত হলে কোন ব্যক্তি পুলিশ বা ট্রাইব্যুনালের নিকট উক্ত অপরাধ সংগঠনের অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবে এবং পুলিশ এই ধরণের অভিযোগ আনয়নকারী ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান করিবে এবং প্রয়োজনে নাম পরিচয় গোপন রাখিবে। এই আইনের ১৯ ধারায় তদন্তের জন্য থানা উপ-পরিদর্শক এর নিম্ন পদমর্যাদা নহে এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তকার্য সম্পন্ন করবে এবং তদন্তের জন্য প্রাপ্তির পর হইতে পরবর্তী ৯০ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত সম্পন্ন করবেন। তবে অতিঃ ৩০দিন বাড়াতে পারবে শর্ত সাপেক্ষে। মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন দায়রা জজ আদাত বা অতিঃ দায়রা জজ আদালত পদমর্যাদার বিচারক কিন্তু ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচার এই দায়িত্ব পালন করবেন। এই আইনের বিধান মতে অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সম্পন্ন করিবে। যদি ব্যর্থ হয় তাহলে ১০ কার্য দিবসের মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে হাইকোর্ট বিভাগ প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। এই আইনে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবত্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

সাগর পথে ও অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশ যাত্রাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে ৫৩ হাজার বাংলাদেশী। ২০১২ খ্রিস্টাব্দ হইতে এই পর্যন্ত এর পরিমাণ ১,২০,০০০/- জন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রতিবেদনে এইসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কক্সবাজার সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার সুবাদে এই জেলায় মানবপাচারের চিত্র আরো ভয়াবহ। সাগর পথে মানবপাচার হয় কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ দিয়ে। এখন শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মানুষই নয় দালালের খপ্পরে পড়ে এখন বাংলাদেশের সব জেলার লোকজন এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। সাগর পথে ও অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে এই পর্যন্ত হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। নিখোঁজের ঘটনা নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। পাচার হওয়া অনেক মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। আইন, জীবনের ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা কিছুই অবৈধভাবে বিদেশ পাড়িকে বন্ধ করতে পারছে না। দিন দিন এর সংখ্যা ভয়ানক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশী সাধারণ নিরীহ লোকজনকে পাচারকারীরা বেশী বেতনের লোভ দেখিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার করছে।

ইউ.এন.এইচ.সি.আর-র একটি প্রতিবেদনে মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই পর্যন্ত ৫৩ হাজার লোক সাগর পথে পাড়ি জমিয়েছে এবং ৫৪০জন পাড়ি জমাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ইতোমধ্যে শুধু মালয়েশিয়ায় আটক হয়েছে ৫০০০ এরও বেশি। পুলিশ মনিটরিং সেলের তথ্য অনুসারে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে মোট ৩৭৭টি মামলা হয়েছে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই পর্যন্ত ২৮৭টি মামলা হয়েছে। ২৬১২ জন মানবপাচারের শিকার হয়েছে এবং ২২৬৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মানবপাচারের বিভিন্ন মামলায় অনেককে আটক করা হলেও মূল অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে:

১)       নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সম্পাদন করা।

২)       উদ্ধারকৃত ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩)      তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগে বিজ্ঞ পি.পি’র মতামত নেওয়া।

৪)       ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য বিচার কার্যক্রমে মহিলা জনবল বৃদ্ধি করা।

৫)       প্রতিটি জেলা মানসম্মত শেল্টার হোম গঠন করা।

৬)      বিচারিক আদালত মামলা বিচারে সহনশীল আচরণের মাধ্যমে আদালত যথাযথ পরিবেশ গড়ে তোলা।

৭)       মানবপাচারের ভিকটিমকে উদ্ধার ও পুনঃবার্সনের জন্য বিভিন্ন দেশের দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করা।

৮)      ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে রায় পরবর্তী ক্ষতিপূরণ দ্রুত আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

৯)      দ্রুত মানবপাচার তহবিল গঠন করা ইত্যাদি।

আসুন আমরা সবাই মানবপাচার প্রতিরোধ করি। দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্ গঠন করি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই।

Leave a Reply

%d bloggers like this: