মালিহা

shima

-: সীমা চন্দ্র নম :-

বাবা মায়ের আদরের মেয়ে ছিল মালিহা। মালিহার তিন ভাই, মালিহা যেহেতু ছোট ছিল, তাই বাবা মায়ের আদরের মনি ছিল মালিহা। মালিহার দেহের সৌন্দর্যের কাছে, হাজারো নারীর সৌন্দর্য পরাজিত হবে। যেমনি ছিল তার রুপ তেমনি ছিল চলনভঙ্গি। মালিহা মাঝে মাঝে সইদের নিয়ে নদীতে পানি আনতে যায়। সুরেস শহরে থাকে, গ্রামে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। “শহরে সে এম.বি.বি.এস ডাক্তার”। সুরেস একদিন মামাতো ভাইদের নিয়ে নদীতে ঘুরতে যাই। সেখানে মামাতো ভাইদের নিয়ে গল্প করে, নদীর ধারে বসে। মালিহা সেদিন নদীতে পানি আনতে যায় সইদের নিয়ে। সুরেস মালিহাকে দেখতে পাই, সুরেস যেন মালিহাকে দেখে অবাক হয়ে যায়, এত সুন্দর! এত রুপবতী! শহরে কখনো দেখেনি। পূর্ণিমার চাঁদও যেন মালিহাকে দেখে উন্মাদ হয়ে যাবে। সুরেস মামাতো ভাইদের জিজ্ঞেস করে লাল শাড়ি পড়া মেয়েটির নাম কি? ওর নাম মালিহা, ওর বাড়ি কোথায়? মামাতো ভাই শুভ বলল, নদীর উত্তরের গাঁয়ে ওদের বাড়ি, ওর বাবা মুচি কাজ করে, মালিহা কোমরে কলসি নিয়ে হাসতে হাসতে উত্তর দিকে চলে গেল। সেই হাসি শুনতে লাগল সুরেস, সেই হাসিতে মধুর সুর। সুরেস মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যেই করে হোক মালিহাকে আমার চাই। বিকেল হয়ে আসাতে মামাতো ভাইদের নিয়ে বাড়িতে চলে গেল। সুরেস ভাবল, কি করে বলবে গ্রামের এক মেয়েকে সে ভালবেসে ফেলেছে। মালিহার মতো মেয়েকে না পেলে তার জীবনে বেঁচে থেকে লাভ নেই। সুরেস মনে মনে ভাবল আমিতো ছোট নয়, আমার পছন্দ রয়েছে, আমার স্বাধীনতা রয়েছে।

এদিকে মালিহাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার বাবা পাত্র খুঁজছে। বিভিন্ন পাত্র আসে তার বাবা-ভাইদের পাত্র পছন্দ হয় না। সুরেস বাবাকে গিয়ে বলল মালিহাকে বিয়ে করার কথা, কিন্তু সুরেসের মা-বাবা মেনে নেই না। সুরেসের বাবা বলল, মালিহার বাবা ছিল গরিব এবং নিচু বংশের, আমাদের সাথে ওদের কোনো যোগ্যতা নেই। সুরেস মালিহাকে পাওয়ার জন্য খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মালিহাকে যে সুরেস এত ভালবাসে সেটা মালিহার অজানা। মালিহাকে বিয়ে দেওয়ার মতো ভাল পাত্র পাওয়া গিয়েছে। পাত্র ও পাত্রের মা-বাবা এসেছে। মালিহার মা-বাবা ভাই, রাজি হলেন বিয়েতে। ‘মালিহার বাবা পাত্র পক্ষকে অনেক সমাধর করল, দিন, তারিখ ঠিক হয়ে গেল। যৌতুক ধরল বিরাট অঙ্কের। অর্ধেক নগদ আর অর্ধেক বাকি’। মালিহা সইদের থেকে জিজ্ঞেস করে বরের নাম কি? সুরেস, সে শহরের বড় ডাক্তার। মালিহা সইদের কাছ থেকে শুনেছে সুরেস মালিহাকে পাওয়ার জন্য আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। মালিহা ভাবল, আমি আমার জীবনে সুরেসের মতো একজনকে চেয়েছিলাম, যে আমাকে নিজের জীবনের চাইতে বেশি ভালবাসবে। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। মালিহাকে নিয়ে শহরে চলে আসল সুরেস ও তার পরিবার। সুরেস লক্ষ্যে করল, ছাদে মালিহা দাঁড়িয়ে আছে, শহরের কোলাহল, যানবাহনের আসা-যাওয়া দেখছে। সুরেস ভাবল গ্রামে থাকা মেয়ে, শহরে এসে কেমন খারাপ লাগছে, মালিহার পাশেতো আমার থাকা দরকার। সুরেস মালিহার হাতের উপর হাত রাখল, মালিহা চমকে উঠল। মালিহা সুরেসের দিকে তাকাল, সুরেস তাকাল মালিহার দিকে। সুরেস মালিহার চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না। কারন, মালিহার দুটো চোখ এমন মায়ায় আছন্ন করে ফেলে, সুরেস মালিহার হাতে একটা গোলাপ ফুল দিল। মালিহা মুছকি হাসল, সুরেস মালিহার মুখে হাত রাখল বলল তোমার এই হাসি আমাকে উন্মাদ করে ফেলে। মালিহা জানে সুরেস কাল কলকাতা চলে যাবে। কলকাতাই সুরেসের ডাক্তারি প্রশিক্ষণ রয়েছে, প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হবে। মালিহা রাতে সুরেসের ব্যাগে কাপড় গুছিয়ে রাখে। মালিহাকে দেখে সুরেস জিজ্ঞেস করে, মালিহা তুমি কি আমাকে ভালবাস? ভাল না বাসলে কি আর তোমার সাথে শহরে পাড়ি জমাতাম। তোমার অস্তিত্ব যেদিন আমার কাছে থাকবে না, সেদিন মৃত্যু ছাড়া আর কিছু হবে না। মালিহা আমি যে তোমার প্রতি এত দূর্বল হয়ে গিয়েছি তোমাকে না দেখে দু-বছর কিভাবে কলকাতা কাটাবো। মালিহা আজকে আমি তোমাকে প্রাণভরে ভালোবাসব, তোমার দিকে সারারাত তাকিয়ে থাকব।

সুরেসের মা, সুরেসকে ডাকছে ‘সুরেস’ বের হয়ে গেল রুম থেকে। সকালে সুরেস বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। গাড়িতে সবকিছু ঠিকঠাক করে দিল বাড়ির চাকররা। সুরেস মা-বাবাকে প্রনাম করল। সুরেস গাড়িতে উঠল, মালিহার দিকে তাকিয়ে থাকল সুরেস, মালিহার দু-চোখে জল আমি পেয়েছি সত্যিকারের ভালবাসার মানুষ খুঁজে পেয়েছি। মালিহার মুখে শুধু হাসি দেখেছে, এই প্রথম চোখে জল দেখল। মালিহা চেয়ে থাকল সুরেসের গাড়ি অদূরে চলে গেল। এভাবে দু-চারদিন কেটে গেল। ‘মালিহার মা-বাবা, ভাইদের কথা মনে পড়ে গেল, কতদিন ধরে তাদের দেখেনি’। কিন্তু মালিহার কি করে বলবে? শ্বশুর-শ্বাশুড়ী যে যৌতুকের বাকি অর্ধেক টাকার জন্য চাপ দিল। মালিহা বুঝতে পারে মালিহাকে শ্বশুর-শ্বশুড়ি যৌতুকের টাকার বিনিময়ে বউ করে আনে। মালিহা ফোন করে বাবাকে যৌতুকের বাকি অর্ধেক টাকার জন্য। “মালিহার বাবা মেয়ের সুখের জন্য নিজের শরীরের একটি কিডনী বিক্রি করে দেয়”। কিডনি বিক্রি করে যৌতুকের টাকা নিয়ে শহরে আসে মালিহার বাবা। এতদিন পর শ্বশুর বাড়িতে আসল মালিহার বাবার কোনো সমাদর করা হল না। মালিহার বাবা মালিহার শ্বশুরকে যৌতকের টাকা দিল। মালিহা বারান্দায় বসে আছে, মালিহার এমন অবস্থায় দেখে, আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না মালিহার বাবা। মালিহাকে চেনা যায়না, চেহারার এমন অবস্থা হয়েছে। মালিহা কান্না করছে বাবার দিখে তাকিয়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মালিহার। চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেল। চুলগুলো উসকু-খুশকু শরীরের কোনো যন্ত নেই। তুই কি মা খাওয়া-দাওয়া করিস না? করি বাবা, চিন্তা করো না। সুরেস আসলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, সে আমাকে অনেক ভালবাসে। সেদিন বিকেলে চলে গেল মালিহার বাবা। ‘পরদিন সকালে মালিহার শ্বাশুড়ী এসে মালিহাকে বলল, বাড়িতে মেহমান আসবে সব ঠিকঠাক করে রেখো এবং বাড়ির গেষ্ট রুমগুলো পরিষ্কার-পরিছন্ন করে রাখবে।’ মালিহার রান্না-বান্না করল এবং ঘরগুলো সুন্দর করে সাজালো। দুপুরে অতিথিরা বেড়াতে আসল। অতিথিরা খাবার টেবিলে বসল, অতিথিদের মধ্যে একজন বলল, সুরেস বিয়ে করেছে শুনেছি, সুরেসের বউকে দেখছি না যে? মালিহা অতিথিদের জন্য খাবার নিয়ে আসল। সুরেসের মা বলল এই হলো সুরেসের বউ। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় জিজ্ঞেস করল, তোমার লেখাপড়া কতটুকু? মালিহা বলল, গরিবের মেয়ে তাই বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারিনি। “ছি! ছি! লাজে মরে যাই, এম.বি.বি.এস ডাক্তারের জন্য অশিক্ষিত মেয়ে”। আরেকজন অতিথি বলল, তোমার বাবা কি করে? মুচি কাজ করে, “অতিথিরা বলল মুচির মেয়ের হাতের রান্না করা খাবার আমরা খেতে পারবো না, অতিথীরা না খেয়ে চলে গেল”। এত অপমান! সহ্য হলো না মালিহার। মালিহা তার রুমে চলে গেল। শ্বশুর-শ্বাশুড়ী মালিহাকে তিরস্কার করতে লাগল, মুচির মেয়ের জন্য অতিথীদের কাছে মাথা নিচু হয়ে গেল। সেদিনের সে অপমানের বদলা নিতে মালিহার উপর রাতে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী অমানষিক নির্যাতন চালায়। মালিহাকে এমনভাবে মারধর করল বাড়ির চাকররাও চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। ‘মালিহাকে দুদিন ধরে কোন খাবার দেওয়া হল না। মালিহার চলার শক্তি, কথা বলার শক্তি যেন হারিয়ে যাচ্ছে, মৃত্যু যেন ঘনিয়ে এল’। ‘হঠাৎ! মালিহার মোবাইলে ফোন আসল সুরেসের, মালিহা ফোন রিসিভ করে বলে, তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। এটা তোমার সাথে আমার শেষ কথা। সুরেস বলে মালিহা তুমি পাগলের মতো উল্টাপাল্টা কথা বলছো কেন, বাড়িতে কি কিছু হয়েছে? মালিহা আমার হৃদয় তোমার জন্য কদিন ধরে ছটপট করছে। মালিহা তুমি কেমন আছ? আমি ভালো আছি। তোমার আমার ভালবাসা হেরে গেল অট্রালিকার কাছে, তোমার সাথে পরজন্মে দেখা হবে, আমাকে ক্ষমা করে দিও। মালিহা! মালিহা! মালিহা!। ফোনটা কেটে গেল, ফোনে আর কথা শোনা গেল না। সকালে এসে বাড়ির চাকর দেখে মালিহা পড়ে রয়েছে মাটিতে। ছয় দিন পর সুরেস বাড়িতে চলে আসে। সুরেস সারা বাড়িতে মালিহাকে খুঁজে। “সুরেসের মা এসে বলে মালিহা ডায়রিয়া হয়ে মারা গিয়েছে”। তোমার জন্য মালিহার চাইতে সুন্দরী পাত্রী চেয়ে রেখেছি। “আমি মালিহার চাইতে সুন্দরী পাত্রী পাব, কিন্তু মালিহাকেতো আর পাব না” কি অপরাধ করেছিল মালিহা? সুরেসের কোনো কিছু অজানা ছিল না। সুরেস যে মালিহার মৃত্যুতে পাগল হয়ে গেল, রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে মালিহার ছবি নিয়ে।

%d bloggers like this: