Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / বিনোদন ও সাংস্কৃতিক / শঙ্খচিলের কান্না ভেজা সন্ধ্যাবেলা…

শঙ্খচিলের কান্না ভেজা সন্ধ্যাবেলা…

Shngkhacil - 2

শেষটা এমন হবে কেউ ভাবেনি। সন্ধ্যাবেলায় গৌতম ঘোষ নির্মিত ‘শঙ্খচিল’দেখতে আসা মানুষগুলো বেশ ফূর্তিতেই ছিলেন। কিন্তু সিনেমার পর্দায় ডুবে গিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারে বিদ্ধ এক করূণ গল্পের চাপচাপ কষ্ট নিয়েই বেরুতে হল। বাইরে তখন প্রসেনজিত্ দাঁড়িয়ে। যিনি গল্পের মূল নায়ক। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় আর শুভেচ্ছায় হাসছিলেন। প্রসেনজিত্’কে পেয়েই জড়িয়ে ধরলেন জয়া। স্বয়ং মন্ত্রী নূর প্রসেনজিতকে শুভেচ্ছা জানাতে পাশে দাঁড়ালেন বেশ কিছুক্ষণ।

সে থাক, শুরুর কথায় আসি। ‘যখনই বাংলাদেশে কোনো কাজ করতে আসি, তখন আমার বিপুল আনন্দ হয়। এরআগে আমার দুইটি স্মরণীয় সিনেমা ‘মনের মানুষ’ ও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এখানে করে গেছি। আসলে বাংলাদেশে আমার শেকড় লুকিয়ে আছে।’ ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় নতুন ছবি ‘শঙ্খচিল’-এর প্রিমিয়ার শো’তে এসে কথাগুলো বলছিলেন এই সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম মেধাবী নির্মাতা গৌতম ঘোষ।

Shngkhacil - 3

বাংলা নতুন বছর উপলক্ষ্যে আসছে শুক্রবার বাংলাদেশ ও ভারতে একযোগে মুক্তি পেতে যাচ্ছে জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিত্ ও কুসুম শিকদার অভিনীত গৌতম ঘোষের ছবি ‘শঙ্খচিল’। আর এ উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে ঢাকা আসেন গৌতম ঘোষ ও পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় তারকা অভিনেতা প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়। রাজধানীর বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্সে এদিন সন্ধ্যায় প্রিমিয়ার শো’র আগে কথা বলেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে।

কথা ছিল বিকাল সাড়ে চারটায় বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে হবে ‘শঙ্খচিল’ ছবির প্রিমিয়ার। সে অনুযায়ি দাওয়াতপত্রও করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ করেই সময় পরিবর্তন করে করা হয় সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা। দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘শঙ্খচিল’-এর বিশেষ শো’টি দেখতে তাই দিন শেষে চৈত্রের তীব্র তাপ আর ঢাকা শহরের মহা জ্যাম উপেক্ষা করে সিনেপ্লেক্সে হাজির হতে থাকেন বাংলাদেশের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জগতের গুণী মানুষজন। হাসান ইমাম, মামুনুর রশিদ, আসাদুজ্জামান নূর, ‘শুনতে কি পাও!’ নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন, জয়া আহসান এবং শাওনসহ এ প্রজন্মের মঞ্চ, ছোটপর্দা এবং ফিল্মের অনেক জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী ও নির্মাতা।

Shngkhacil - 1

সিনেপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকার আগেই চোখে পড়লো সরু ‘লাল গালিচা’ পাতা,যার দুইধারে সুসজ্জিত কিন্তু প্রকান্ড ফুলদানি! তখন ঘড়িতে প্রায় পৌনে সাত। কিন্তু প্রিমিয়ারে যোগ দিতে তখনো আসেননি নায়ক প্রসেনজিত্। জানানো হল তিনি রাস্তায় আছেন! শিগগিরই এসে যোগ দিবেন। এরইমধ্যে সিনেপ্লেক্সে প্রবেশের সামনেই এক কর্নারে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে প্রিমিয়ারপূর্ব কথা বলতে দাঁড়িয়ে গেলেন ছবির ইমপ্রেস টেলিফিল্মের কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগর। পাশে ডেকে দাঁড় করালেন ‘শঙ্খচিল’ ছবির নির্মাতা গৌতম ঘোষ, মামুনুর রশিদ, অভিনেত্রী কুসুম শিকদার, নবাগতা সাঁজবাতিসহ এই ছবির অন্যান্য কলাকুশলীদের।

প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানের আগে ফরিদুর রেজা সাগর ‘শঙ্খচিল’ নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাভাষায় এমন একটি সিনেমা নির্মাণ হলো যা দেখে মানুষ বলতে বাধ্য হবে যে আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশ।

গৌতম ঘোষ বলেন, শঙ্খচিল এর বিশেষ প্রদর্শনীতে আসার জন্য এই সন্ধ্যায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। আমি খুবই আনন্দিত, কারণ আমি আগেই এখানে আমার দুই স্মরণীয় সিনেমা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘মনের মানুষ’ করে গেছি। বাংলাদেশেই আমার শেকড় লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা আমি কখনোই ভুলি না। আমি যখনই বাংলাদেশের কোনো কাজ করি তখন আমার বিপুল আনন্দ হয়। তাই বলি, শঙ্খচিল আপনারা দেখুন। দেখে আপনাদের মতামত জানান। ছবিটি হচ্ছে একটি দুরন্ত আশা, ও উড়ন্ত পাখির রূপক।

১২ এপ্রিল ছিল কুসুম শিকদারের জন্মদিন। জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ভারতীয় নির্মাতা গৌতম ঘোষ এবং কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিত্-এর সঙ্গে কাজ করার ফসল বাংলার মানুষের সঙ্গে বসে উপভোগ করতে পারছেন এই জন্য চরম উত্তেজিত তিনিও। তার কথায় সেই উত্তেজনা ছিল দৃশ্যমান। ‘শঙ্খচিল’ নিয়ে কুসুম শিকদার বলেন, এই মুহূর্তে কথা বলার স্পর্ধা আমার কমে যাচ্ছে। আমার এত নিকটে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন (গৌতম ঘোষকে লক্ষ্য কর) আমার এখনো ভাবতে অবিশ্বাস হচ্ছে যে ইন্টারনেশনালি যে মানুষটি খ্যাতিমান তার ছবিতে আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। মনে হয় ঘোরের মধ্যে আছি। এরজন্য প্রথমে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই, আর তারপর গৌতম স্যারকে। যিনি আমাকে সহ্য করেছেন, এবং আমাকে এই চরিত্রটির জন্য নির্বাচন করেছেন। এটা আমার জীবনের অত্যন্ত বড় একটা অর্জন। তারচেয়ে বড় অর্জন ছবিটি মুক্তির আগেই ভারতের নেশনাল অ্যাওয়ার্ড জিতে নিল। এটা সত্যিই বিশাল একটা অর্জন।

শঙ্খচিল ছবির বিষয়বস্তুকে আন্তর্জাতিক মানের উল্লেখ করে কুসুম শিকদার আরো বলেন, শঙ্খচিল ছবিটি এমন একটি ইস্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে আমার মনে হয় পৃথিবীর যে কোনো ভাষা সংস্কৃতিতেই হোক না কেন তাদের স্পর্শ করে যাবে।

যেহেতু সিনেমাটি সীমান্ত নিয়ে, এবং অধিকাংশ শুটিংও হয়েছে দুই দেশের সীমান্তে। ফলে শুটিং করার প্রয়োজনেই দুই দেশের বর্ডার গার্ডদের অনুমতি নিতে হয়েছিল। ছবিতে ছিল তাদেরও সতস্ফুর্ত অংশ গ্রহণ। সিনেমার প্রিমিয়ার উপলক্ষে সিনেপ্লেক্সে তাই হাজির হয়ে ছিলেন ছবিটির শুটিংয়ের সময় নানাভাবে সহযোগিতা করা বাংলাদেশ বিজিবির মেজর জেনারেল আলিফ আহমেদ। মাইক্রোফোন হাতে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আসলে একটা ভিন্ন পরিবেশে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি। কথা বলছি। আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ। ছবিটির কিছু অংশ চিত্রায়ন করা হয়েছে সীমান্তে। সেখানে ভারত থেকে বিএসএফ এবং বাংলাদেশ থেকে আমরা বিজেবি যতটুকু সহায়তা করা দরকার, আমরা করেছি। শুনেছি ছবিটি নাকি অত্যন্ত উঁচু মানের একটি ছবি হয়েছে।

মাইক্রোফোন ঘুরে এবার এল শঙ্খচিল সিনেমার মধ্য দিয়ে অভিনয়ে পা রাখা বাংলাদেশের মেয়ে সাঁজবাতির হাতে। তার আগে ফরিদুর রেজা সাগর সাঁজবাতি সম্পর্কে বললেন, এই ছবিতে একজন নতুন অভিনেত্রী আসছেন। তার নাম সাঁজবাতি। আলোকজ্বল করে সে বাংলাদেশকে ছবির পর্দায় দারুণভাবে তুলে ধরবে এটা আমাদের প্রত্যাশা। মাইক্রোফন হাতে ধরেই এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সাঁঝবাতি বলে উঠলেন, আমি আর কি বলবো। এটাতো আমার সবে প্রথম সিনেমা। সবাই আমার জন্য দোযা করবেন। আর সিনেমা হলে গিয়ে আশা করি সবাই সিনেমাটা দেখবেন।

Shngkhacil - 4

এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে মিডিয়াকর্মীদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন শঙ্খচিল ছবির কলাকুশলীরা, সিনেপ্লেক্সের ভেতরে তখন খোশগল্প চলছে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে। এরপর হঠাত্ সিনেপ্লেক্সের সুবিশাল পর্দায় ভেসে উঠে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, পতপত করে উড়ে চলেছে আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘আমার সোনার বাংলা’। একযোগে দাঁড়িয়ে গেলেন সবাই। উত্সর্গপত্রে ভেসে এল বাংলা চলচ্চিত্রের স্রষ্ঠাস্থানীয় নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের নাম। যে মানুষটি মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি দুই বাংলার ভাঙন। কিন্তু হলভর্তি মানুষের এতসব ভাবনার সময় নেই, তারা ধীরে ধীরে ডুবে গেলেন শঙ্খচিলে। যে চিল মানে না কোনো সীমানা, মানে না কোনো প্রাচীর!

শুধু যুগে যুগে দেশভাগের যন্ত্রণা আর কান্নাভেজা স্মৃতিগুলো বয়ে বেড়ায়, এমন গল্পেই দুই বাংলার নতুন নির্মাণ ‘শঙ্খচিল’।

সূত্র: বাংলামেইল২৪ডটকম,ডেস্ক।

%d bloggers like this: