সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২, ১০:২৩ অপরাহ্ন

শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর চলাচলে দূর্ভোগ : উখিয়া সীমান্তে বন ও পাহাড় কেটে মৎস্য চাষ প্রকল্প : পরিবেশ বিপন্ন

হুমায়ুন কবির জুশান; উখিয়া :

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের উখিয়ার অজপাড়া গাঁ হাতিমোরাতে অর্ধ শতাধিক একর আবাদি জমি ও সংরক্ষিত বনভূমি জবর দখল করে পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে মৎস্য চাষ প্রকল্প। মৌলানা সিরাজুল ইসলাম ও চট্টগ্রামের কতিপয় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের অর্থায়নে বন বিভাগের রক্ষিত ও সংরক্ষিত পাহাড় কেটে চাষাবাদের জমিতে বাঁধ দিয়ে, বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় শিক্ষার্থী ও সর্বসাধারনের চলাচলের পথ প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন ঘুরে এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, উখিয়া বন রেঞ্জের উখিয়া সদর বন বিটের আওতাধীন রক্ষিত ও সংরক্ষিত বনভূমি বেষ্টিত পাহাড় টিলার খাদে খাদে ও চাষাবাদের জমিতে বাঁধ দিয়ে মৎস্য চাষ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। বনভূমি, খাস ও জোত জমি, বসবাসরত আশ পাশের স্থানীয় লোক জানান, এখানে তাদের যৎসামান্য চাষাবাদের জমি রয়েছে। উক্ত জমিগুলো ১০বছরের জন্য লিখিত চুক্তিবদ্ধতার মাধ্যমে মৌলান সিরাজুল ইসলাম দখলে নিয়েছে। গত দু’মাস ধরে পরিবেশ ও বন সহ যাবতীয় আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বোল্ড ড্রেজার দিয়ে পাহাড়ি টিলা সাবাড় করে মৎস্য ঘেরের বাঁধ ও যাতায়াতের রাস্তা নির্মান কাজ করা হচ্ছে।

রাজাপালং ইউনিয়নের হাতি মুড়া ও দক্ষিণ দরগাহ বিল এলাকার গহীন বনাঞ্চল ঘেরা এ এলাকায় অর্ধ শতাধিক একরের মত জোত জমির একাংশে ও সংলগ্ন বিপুল পরিমানের সংরক্ষিত বন ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘটিয়ে মৎস্য ঘের করার ঘটনা নিয়ে এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে বিরূপ প্রভাব পড়লেও প্রতিপক্ষরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কেউ মুখ খুলছে না। ২বছর পূর্বে রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হাতিমোরা হতে পার্বত্য নাইক্ষংছড়ির মিয়ানমার সংলগ্ন আজু খাইয়া গ্রাম পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মান করায় সেখানকার কয়েক গ্রামের অসংখ্য লোক জনের যাতায়াত সুবিধা সম্প্রসারিত হয়। ওই জনচলাচলের রাস্তাটি জবর দখল করে মৎস্য ঘের করায় সে সড়কটি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আশ পাশের ৩/৪টি গ্রামের কয়েকশ পরিবার যাতায়াত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ওইসব গ্রামের স্কুল গামি শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে পাচ্ছে না বলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ। অভিযোগ করে স্থানীয় নজির আহমদ, ইয়াকুব আলীসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, সুস্থ লোকজন কোন রকম চলাচল করতে পারলেও অসুস্থ রোগী, বয়োবৃদ্ধ লোকজনকে বিকল্প পথে হাসপাতল সহ হাট বাজারে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

স্থানীয় হাতিমোরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী ক্ষোভের সাথে জানান প্রায় এক বছর ধরে পূর্ব দরগাহ বিল, বাগান মুড়া, আজু খাইয়া, দক্ষিণ হাতি মুড়ার অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে আসতে পাচ্ছে না। কারণ জনচলাচলের রাস্তা, পথ, আইল সব কিছু মৎস্য ঘেরে চলে যাওয়ার সুবাধে যাতায়াতের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মৎস্য ঘের এলাকায় জমির মালিক মৌলভী কবির আহমদ জানান প্রতি সনে নবায়নের শর্তে স্থানীয় লোকজনের সাথে ১০ বছরের চুক্তিতে মৌলভী সিরাজকে জমি দেওয়া হয়। শর্তে উল্লেখিত রয়েছে আবাদি ধানি জমি কোন রূপ শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু প্রতিপক্ষরা উক্ত শর্তাবলি অমান্য করেপাহাড় কাটা মাটি দিয়ে রাস্তা তৈরি ও ধানি জমিতে মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলেছে। রাস্তা তৈরির নামে মৎস্য ঘেরের মাটির বাঁধ দেওয়ার ফলে অনেক পরিবারের লোকজন ঘর থেকে বের হতে পারছে না। তিনি আরো বলেন, সে আট কানি জোত জমি চুক্তিবদ্ধ করেছে। চুক্তি বাইরে তার দখলী বিভিন্ন ফলজ, বনজ বাগানের পাহাড়, টিলা বোল্ড ড্রেজার দিয়ে বেআইনি ভাবে কেটে উজাড় করে ফেলছে। এতে তার বাগানের আম, কাঁঠাল, আকাশ মনি সহ অন্ততঃ তিন শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অপর জমির মালিক বসির আহাম্মদ বলেন, তারা ওই মৌলভীর মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে চরম ভুল করে জমি হস্তান্তর করেছি। যার খেসারত দিতে হচ্ছে ৪ গ্রামের অসংখ্যা মানুষ সহ স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজগামী শত শত শিক্ষার্থীদের।

জমির মালিক সুলতান আহাম্মদ, নুরুল আলম, বিধবা সামারুপ বেগম সহ অনেকে বলেন মৌলভী সিরাজুল এর সাথে আমাদের যে চুক্তিপত্র তা সে প্রতি নিয়ত লংঘন করে যাচ্ছে। মৎস্য ঘের হলে এলাকার লোকজনের কর্ম সংস্থান ও উন্নয়ন হবে ভেবে আমরা তাকে জমি দিয়ে সহযোগীতা করি। কিন্তু আমাদের একমাত্র সম্বল জমি টুকুর যে অবস্থা করেছে, তা অপূরণীয় ক্ষতির সামিল।

রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, মৎস্য ঘের এলাকায় লোকজনের যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা, কালভার্ট নির্মান করা হয়েছিল। জানতে পেরেছি ঘের মালিক পক্ষ সেটি জবর দখল করে ঘের বানিয়েছে এবং জনচলাচলের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অনেক জমির মালিক নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অভিযোগ করছে।

উখিয়া সদর বন বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, কিছুদিন পূর্বে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘের মালিককে বনভূমি ও গাছপালা না কাটার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে তা নিয়ে স্থানীয় বনবিভাগ মামলার বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না।

উখিয়া বন রেঞ্চ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উক্ত মৎস্য ঘের পরিদর্শন করে বেশ কিছু স্থানে পাহাড়, টিলা ও গাছ কাটার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উক্ত ঘের মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। উক্ত ঘের মালিক মৌলভী সিরাজুল ইসলামের হয়ে তার ছোট ভাই ডাক্তার সুরত আলম ঘেরের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকেন। তিনি জানান এলাকার উন্নয়ন করতে গেলে টুকটাক কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ বা মৎস্য অধিদপ্তর সহ কোন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পূর্ব অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

https://www.facebook.com/coxviewnews

Design BY Hostitbd.Com