Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / কলাম / ‍”শিশুশ্রম বন্ধে করণীয়”

‍”শিশুশ্রম বন্ধে করণীয়”

Sayed Rezaur Rahaman - 2-:  সৈয়দ মোঃ রেজাউর রহমান এডভোকেট  :-

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত্। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শিশু। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও আমাদের দেশের শিশু আইন, ২০১৩-তে ১৮ বছরের নিচের বয়সি সবাইকে শিশু বলে অভিহিত করা হয়েছে। শিশুদের দিয়ে কোন কাজ করানো হলো শিশুশ্রম বা শিশুদের যেকোন কাজে নিয়েজিত করাই হলো শিশুশ্রম। যা পৃথিবীর সবদেশে আইনত নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১১, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৯ ও ২০ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাসহ শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে বাংলাদেশের দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিশুই কোন না কোন কাজে নিয়োজিত। শিশুদের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ব্যবহার করা হয় কাজে। আবার অনেক সময় শ্রম অনুযায়ী পারিশ্রমিকও জুটেনা। অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পারিবারিক প্রয়োজনে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে শিশুশ্রম দেখা যায়। বিশ্বের সব সমাজ ও রাষ্ট্রে শিশুদের কিছু কিছু উত্পাদনমূলক কাজে যুক্ত থাকাটা যদিও সাধারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তারপরও শিশুশ্রম সমগ্র বিশ্বে আজ বিশেষ উদ্বেগের কারণ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিশুই কোন না কোন কাজে নিয়োজিত। কিন্তু আমাদের দেশে শিশুশ্রমের ভয়াবহ চিত্র দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই যে আমাদের আইনেও শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা হিসেব মতে, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। উচ্চহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দূর্যোগের মতো বিষয়গুলোর কারণে বাংলাদেশের মতে দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশে শিশুশ্রমের হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কর্তৃক ২০০৬ সালে পরিচালিত ‘বেইজ লাইন সার্ভে অল চাইল্ড ডোমেস্টিক লেবার ইন বাংলাদেশ এ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সের ৭.৪ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। যাদের মধ্যে ২৮.৬ শতাংশ শিশুশ্রমিক দিনমজুর হিসেবে এবং ২৫.৪ শতাংশ শিশু পরিবহণ খাতে নিযুক্ত রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ পরিচালিত যৌথ সমীক্ষায় দেখা যায়, জাতীয়ভাবে ১২.৮ শতাংশ, বস্তি এলাকা ১৯.১ শতাংশ এবং ১৭.৬ শতাংশ আদিবাসী শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে।

২০০৪ সালে ইংরেজী দৈনিক নিউ নেশনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী বিশ্বের মোট শিশু শ্রমিকের ৫ শতাংশেরও বেশী শিশুশ্রমিক শিল্প, কারখানা, ওয়েল্ডিং কর্মশালা, চামড়া শিল্প, কৃষি খাত, পরিবহণ খাত, নির্মাণ কাজে, বিড়ি কারখানা, জাহাজ ভাঙ্গা, শিল্প রেষ্টুরেন্ট, চা স্টল, গৃহশ্রমিক, পশুপালক, অটোমোবাইল, ওয়ার্কশপ, ব্যাটারী কারখানা, ইটভাটা, কামার দোকান, ডাইং, ইলেক্ট্রিক দোকান, স্বর্ণকার দোকান, কুলিং কর্ণার, মুদ্রণযন্ত্র কারখানা, রিকসা-ভ্যান চালনাসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, মালিকপক্ষ জানেই না, শিশুকে কোন কাজে নিয়োজিত করার ব্যাপারে রয়েছে নানা বিধি নিষেধ। জানে না শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগদাতাদের জন্য দেশের আইনে রয়েছে শাস্তির বিধান। শিশু আইনে বলা আছে, ‘কোন শিশুকে একান্ত প্রয়োজনে অভিভাবকের ইচ্ছায় রেজিস্টার্ড ডাক্তারের শারীরিক সক্ষমতার সার্টিফিকেটের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কিছু কাজে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুরূহ। বরং ক্ষেত্রবিশেষে এসব শিশু-কিশোরকে জাহাজকাটা শিশু থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিং কারখানা, এসি, রেফ্রিজারেটর মেরামতের কারখানায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। শিশু অধিকার সুরক্ষায় ১৯৭৪ সালের শিশু আইনটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ সূলভ শ্রম আইনের দূর্বল প্রয়োগ ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আমাদের দেশের শিশু-কিশোররা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় সম্পৃক্ত।

উন্নত বিশ্বে শিশুশ্রম বন্ধে কড়াকড়ি থাকলেও আমাদের দেশে এ আইন কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। ফলে প্রতিবছর বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শিশু-কিশোররা মৃত্যুমুখে পতিত হলেওমিলছে না কোন প্রতিকার। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে বিবেচনা, প্রচলিত বিচার পদ্ধতি থেকে শিশু বিচার ব্যবস্থা পৃথকীকরণসহ শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থার বিধান রেখে শিশু আইনের যুযোপযোগী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শিশু যৌন নির্যাতন, শোষণ ও পাচার প্রতিরোধের লক্ষ্যে গৃহীত জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা হালনাগাদ করা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃথক শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর বা পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, শিশুদের জন্য ন্যায়পাল অফিস বা শিশু অধিকার কমিশন গঠন, বিভিন্ন দেশের সাথে অপরাধী প্রত্যার্পণ চুক্তি সম্পন্ন করা, দেশের প্রচলিত আইনকে প্রটোকলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে হালনাগাদ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা দিয়ে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে একটি অসহনশীল চেতনা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। শিশুশ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শিশু, অভিভাবক, নিয়োগকারী, ট্রেড ইউনিয়ন, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের সংবেদশীল করা যাতে তারা সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিরসনে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারে। শিশুশ্রম নিরসনে কমিউনিটি ভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রবর্তন ও তাকে শক্তিশালী করতে হবে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দেখতে চাই শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে আমাদের শিশু-কিশোরদের শৈশব ও কৈশোরটা হবে উত্কণ্ঠাহীন ও শঙ্কামুক্ত। যেখানে শিশুদের প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা সরকার পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করবে।

আমরাও দেখতে চাই, শিশুশ্রম বন্ধ হোক। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগও দরকার। কেবল আইন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সবাইকে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের বিশ্বব্যাপী যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে যদি আজ এ মূহুর্ত থেকে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগগুলোকে সমন্বয় করে সরকারের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে যদি আগামী দিনের কর্মসূচী ঢেলে সাজানো হয়, তবে শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

প্রভাষক – কক্সবাজার আইন কলেজ।

Leave a Reply