Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / ঈদের দামী শাড়ী

ঈদের দামী শাড়ী

 

-: সীমা চন্দ্র নম :-

সুমনের মনটা আজ বড়ই অস্থির। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না, দু-দিন ধরে বন্ধুর বাসায়, কোনো উপায় না পেয়ে বন্ধুর বাড়িতে আসা। অফিস থেকে ঘরে গেলে বউয়ের চিৎকার চেচামেচিতে পুরো ঘর গরম হয়ে যায়। ওর চিৎকার-চেচামেচি এসি রুমও হট হয়ে যাবে। যেখানে দিনে ৫-৬ বার ফোন দেয়, এখনো পর্যন্তও একটা ফোন দেয় নি, তাই আরো অস্থির লাগছে। এবার ঈদের নতুন শাড়ী কিনে দিতে হবে, নতুন শাড়ি না দিলে বাপের বাড়ি চলে যাবে। প্রতি মাসে শপিংয়ে একটা করে শাড়ি থাকে পনের হাজার টাকা দামের, তাও আবার এবার ঈদে পঞ্চাশ হাজার টাকা দামের শাড়ি ও গহনা কিনে দিতে হবে। শাড়ি কেনা নি পুরো মাস ঝগড়াতে কাটছে।

সুমন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ম্যানেজার পোষ্টে চাকরি করে মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে বউয়ের জন্য একটা শাড়ি, বিভিন্ন কসমেটিক নিতে হয়। না নিলে বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। সুমনের বেতনের তিনভাগের দু-ভাগ খরচ হয় শারমিনের পেছনে। প্রতি মাসে একবার করে পার্লারে যায় মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ফেসিয়াল করে। চুল গুলোকে কত রকমের কালার করে, কত রকমের ডিজাইন করে, এসব দেখে সুমনের মাঝে মাঝে বিরক্তি লেগে যায়।

“বিয়ের এক বছর পর্যন্ত চাওয়া-পাওয়াগুলো যদিও সামান্য ছিল, এক বছর পর চাওয়া পাওয়ার বিলাসিতা বেড়ে যায়।” শারমিনের বিলাসিতা কোটিপতি বউয়ের চেয়ে অধিক। চাহিদা পূরণ করতে না পারলে বাড়ির প্রতিটি জিনিসপত্র টুকরো টুকরো করে ফেলে।

শারমিনের সাথে পরিচয় হয় একটি গ্রামে। সুমনের গ্রাম অনেক পছন্দ, সুমন ঠিক করেছিল গ্রামের মেয়ে বিয়ে করবে। একদিন ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে বেড়াতে যায়। অনেক সমবয়সী মেয়েদের নিয়ে বাড়ির উঠানে শারমিন কানামাছি খেলছে। এমন সময় সুমন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। শারমিন চোখ বাধা অবস্থায় সুমনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আর উল্লাসের সাথে বলে ধরে ফেলেছি! ধরে ফেলেছি! সেদিন সমস্ত পৃথিবীর সুখ জড়িয়েছিল আমায়। ক্ষণপরে সে চোখ খুলে দেখে, আমার থেকে দূরে সরে যায়। ওর চোখে ছিল অপূর্ব এক লজ্জা, চেহারায় হাজারো চাঁদের জোৎস্না খেলছে। আর ঠোঁটে মৃদ হাসির ঝর্ণা যেন সমস্ত পৃথিবীর মধুরতা রয়েছে তাতে। যদিও আমি পরখ করিনি। শুধু পলকহীন ভাবে তাকিয়ে থাকলাম ওর পানে, হারালাম নিজেকে মনভোলানো বনে। ‘কখন যে সব মেয়েরা একঝাক চড়ুই পাখির মত উড়ে গেল, তখন আমার স্বপ্নের ঘোর ভাঙে।’ নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হল, আমার জন্য ওদের কানামাছি খেলাটা মাটি হয়ে গেল। রাতে সুমনের শারমিনের কথা মনে পড়ল, “সে বালিকার স্তনজোড়া পদ্মফুলের কুড়ির মত প্রস্ফুটিত হওয়ার অপেক্ষায় এখনও; ওর ঠোঁটের নিচে মৌমাছি ছাক গড়েছে বসন্ত পূর্ণ হলে মধু জমাবে, ভোরের কমলা রৌদ্রের মত তার রূপ।” যেকোনো পুরুষ ওর প্রেমে একপলক দেখে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।

সুমন চোখ বন্ধ করলে শারমিনের চেহারা ভাব-ভঙ্গি ভেসে উঠে। সুমন শারমিনকে বিয়ে করবে ঠিক করল। একপর্যায়ে শারমিনের পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়, শারমিনের পরিবার রাজি হয়। শারমিনকে বিয়ে করে শহরে নিয়ে আসে। জীবনে যাকে পছন্দ করেছে তাকে বিয়ে করেছে। তাকে বিয়ের পর এক মুর্হূতের জন্য কাছে পায়নি কখনো, স্বামীত্বের মর্যাদা পেয়েছে কিনা সন্দেহ; নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য শারমিন সুমনকে বিয়ে করে। নিজের চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে এখনো একটা সন্তানের বাবা হতে পারল না সুমন। কাটার জ্বালার মত বিধে সুমনের হৃদয়ে, তবুও আজ অবধি শারমিনের চাওয়া পাওয়া অপূর্ণ রাখেনি, সাধ্য অনুযায়ী দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শুধু মনে আঘাত লাগে এমন কোনো কথা এখনো বলেনি, কারণ শারমিনকে সুমন অনেক ভালবাসে।

ঈদের এখনো সাতদিন বাকি। সাতদিনের মধ্যে শাড়ি গহনা চাই শারমিন। শারমিনে চেহারাটা বারবার ভেসে উঠছে। চেহারাটা যতটা মায়াবী, সে রকম মনে কোনো দয়া-মায়া নাই। “কখনো এক মুহূর্তের জন্য শারমিন সুমনকে বলে নি, আমি তোমাকে ভালবাসি”। যখনি বাসায় যায় শাড়ি, গহনা, টাক-পয়সা ছাড়া আর কোনো কথা নেই ওর মুখে। শারমিন যতই ঝগড়া করুক সুমন শারমিন একটা দিন না দেখে থাকতে পারে না। কিন্তু আজ দু-দিন ধরে কি করে না দেখে আছে। এমন সহ্য ক্ষমতা কি করে হল ভেবে পাচ্ছে না।

সুমন বাড়িতে গেল শারমিন ডাইনিং টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছে, আর টিভি দেখছে। আমাকে দেখে একবারের জন্য বলল না খেতে বস, দেখেও না দেখার ভান করল। মাঝে মাঝে সুমনকে নিজে তৈরি করে খেতে হয়, না হয় হোটেলে খায়। সুমন ক্লান্ত হয়ে গা-হেলিয়ে খাটের মধ্যে শুয়ে আছে। শারমিন তীব্র গতিতে ঝড়ের বেগে আসল সুমনের কাছে আমার শাড়ি গহনা কোথায়? খিটখিটে মেজাজ বলল, সুমন মনে মনে ভেবেছে শারমিন সংশোধন হয়েছে, কিন্তু না, এটা তার ভুল ধারণা আর শারমিন এত জেদি যেটা বায়না করে সেটা না নিয়ে ছাড়ে না। আমার শাড়ি, গহনা কোথায়, সুমন শুনেও কোনো জবাব না দেওয়াতে টেবিল লাইটা একটা আছাড় মারল। আচ্ছা তুমি এমন করছ কেন? তোমাকে আমি দেবে তো, একটু সময় দাও। কিসের সময় আমি আমার বাপের বাড়িতে যাব না। তাহলে যাও, তোমার বাবা কিনে দেবে। “কি বললি তুই।” ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ এত নিচে নেমে গেল শারমিন; সুমনের মেজাজটা এত বেড়ে গেলে যেন মনে হচ্ছে মারমিনের দুই গালে দুইটা কসে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। তবুও নিজেকে সামলাল, আমি আজকের মধ্যে শাড়ি চাই, না হলে পুরো বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেব। তোমার যা খুশি তাই কর। এ কথা বলাতে ওর চিৎকার-চেচামেচি আরো দ্বিগুণ হয়ে গেল। ওর চিৎকার-চেচামেচিতে সুমনের কানটা বধির হওয়ার মত অবস্থা, এমন মেয়ে বাপের জন্মে দেখে নি। কি অশ্লীল ভাষায় গালি-গালাজ করছে। হঠাৎ, করে শারমিন সুকেসের উপর থাকা দশদিন আগে শারমিনের জন্মদিনে উপহার দেওয়া পাথরের ডিজাইন করা পুতুলটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে। তখন সুমন নিজেকে আর সামলাতে পারলে না; সুমন খাট থেকে উঠে জোরে একটা ছড় বসিয়ে দিল শারমিনের গালে; শারমিন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল………।

সুমন বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট ও ম্যাচ কিনল। সিগারেট ধরিয়ে ইচ্ছেমত টানল, দশ মিনিটে পুরো প্যাকেট শেষ করে ফেলল। কখনো খায়নি, আজ খাচ্ছে দুঃখ-অপমানে চোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে জল পড়ছে। “নিজের মা-বাবার মৃত্যুতে এমন ভাবে কাঁদেনি, শারমিনকে বিয়ে করার পর যতবার না কেঁদেছে।” যাকে কখনো গায়ে হাত তুলে নি তার গায়ে আজ হাত তুলল ঘরের এতগুলো জিনিসপত্র ভাংচুর করেছে কখনো শারমিনকে কিছু বলে নি। কিন্তু ভালাবাসার উপহারটি ভেঙ্গে ফেলাতে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না……।

কলিংবেলের শব্দ শুনে শারমিন দরজা খুলে, এক অপরিচিত লোক দরজার সামনে। লোকটার হাতে উপহারের একটা বাক্স, আর একটা চিঠি। ‘ম্যাডাম,’ এগুলো সুমন সাহেব পাঠিয়েছে। শারমিন চিঠি ও উপহারের বাক্সটে হাতে নিল। আচ্ছা আসি তাহলে ম্যাডাম, ওকে বাই, শারমিন দরজা বন্ধ করে দিল। আনন্দে আটখানা হয়ে গেল শারমিন উপহারের বাক্সটা খুলল, দু’টি শাড়ি, গহনা এত টাকা কোথায় পেল সুমন, ঈদের বোনাস ও বেতন মিলেতো মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা পাওয়ার কথা কিন্তু এত টাকা…. ২-৩ লাখ টাকার শাড়ি, গহনা। শারমিন চিঠিটা পড়ে দেখল, হাসি মুখখানা মলিন হয়ে গেল। দু-চোখে অশ্রু গড়িয়ে সে চিঠিতে পড়ল। এ যেন পাথর গলে বরফ হল। শারমিন হাসপাতালে ছুটি গেল। সুমন দেখতে পেল শারমিন আজ অন্যরুপে আজ মনে হল সুমনের স্ত্রীরূপে, সাধারণ নারীর মত শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো এলোমেলো যে মেয়েটি দিন সাত-আটবার চুল আচড়ায় সে কি আজ একবার ও আচড়ায় নি—-।

প্রতিদিন মুখে গাঢ় করে মেকাপের প্রলেপ দেয়, এমনি সুন্দর সেখানে মেকাপের প্রলেপ দেওয়াতে সৌন্দর্য আরো উপছে পড়ে। কিন্তু আজ কোনো কিছুই করে নি। সুমনে পাশে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, এ তুমি কি করলে, আমার জন্য কিডনী বিক্রি করে দিলে। তুমি যদি আমাকে একবার বলতে ভালবাসি; তাহলে তোমাকে এই পৃথিবীটাও হাতের মুটোয় এনে দিতে পারতাম, আমার মৃত্যুর আগে অন্তত একবার বল ভালবাসি, “আই লাভ ইউ সুমন”! “আই লাভ ইউ সুমন”! আমি শাড়ি গহনা চাই না, আমি শুধু তোমাকে চাই। বড্ড দেরি করে ফেলেছ; এই পৃথিবীতে আমি এখন ক্ষণিকের যাত্রী। তোমার কিছু হতে পারে না, তোমাকে ছাড়া কি করে থাকব। তোমার মুখে আজ একথা শুনে বড় সুখী মনে হচ্ছে যেন আরো হাজার বছর বেঁচে থাকি। শারমিনের চোখে লুকায়িত আছে হাজারো প্রেমের এক ফোটা অশ্রু’ বেদনাকিষ্ট হৃদয়ের গ্লানি উপচে পড়ে। অশ্রুসিক্ত মায়াময় আঁখি প্রেমের সমাধিতে আঞ্জলি দিল শারমিন। হাজার বছরের প্রতিক্ষিত রাত আনন্দের বাঁধ ভাঙা ভালবাসার উল্লাসে এসব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অভিমানগুলো। যা কখনো কল্পনা করেনি, সুমন কি স্বপ্ন দেখল শারমিনকে ছুয়ে দেখল, স্বপ্নতো নয় সত্যি! এ রাত বাস্তব মিলনমেলা শারমিনের কঙ্গন এর মধুর শব্দ বাঁচার প্রেরণা যোগায় হাজার বছর। সুমনের হঠাৎ যেন চারিদিকে অন্ধকার লাগছে তার মেয়াদ যেন ফুরিয়ে আসছে চারিদিকে এক অদ্ভুদ শব্দ করে সুমনকে ডাকছে, বুকের মধ্যে ভয়ানক যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে। শারমিন আমাকে একটু জড়িয়ে ধর না, আমার মৃত্যুর ঘন্টা বেজে গেছে। জড়িয়ে ধর না, এ হতে পারে না সুমন তোমার কিছু হবে না, শারমিন জড়িয়ে ধর না, আমি আর পারছি না। শারমিন শক্ত বাধনে জড়িয়ে ধরল সুমনকে। ঠিক এভাবে জড়িয়ে ধরেছিল কানামাছি খেলার সময়। ‘‘হঠাৎ সুমনের হাত দুটি হেলে পড়ল, পুরো শরীর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল। চোখ দুটি নিভে এল। সুমন! সুমন! সুমন শারমিন এত বড় চিৎকার দিয়ে উঠল, যেন সমুদ্রের বিশাল গর্জন……।

বড় বড় শেউলা ঘেরা কষ্টের মরা প্রবাল শারমিনের বুকে চেপে আছে আজ। চারিদিকে ঘুমিয়ে পড়েছে কোলাহলি জনতা। তার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল সুমন, ঘুমিয়ে পড়া জনতা জাগ্রত হলেও সুমন আর কখনো আর জাগ্রত হবে না। এ যেন চির নিদ্রা, এই নিদ্রায় রয়েছে কত মান-অভিমান, কত রাগ-ভালবাসা জড়িয়ে। শারমিনের কান্নার রোল নিস্তব্দ শহরে একমাত্র ইটের তৈরি দেওয়াল, দরজা-জানালা ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় না। আমাকে ক্ষমা করে দিও সুমন আমি তোমাকে বুঝতে পারি নি, বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে…..।

Leave a Reply

%d bloggers like this: