Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / শরণার্থী সমাচার / ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে অসহায় রোহিঙ্গারা : অনুপ্রবেশের সংখ্যা বেড়েই চলছে

ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে অসহায় রোহিঙ্গারা : অনুপ্রবেশের সংখ্যা বেড়েই চলছে

গিয়াস উদ্দিন ভুলু; টেকনাফ :

সীমান্ত এলাকা টেকনাফ উপজেলার চারিদিকে খোলা আকাশের নিছে, অলিতে গলিতে দিশেহারা পাগলের মত ছুটছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। পেটের ক্ষিধা, পানির পিপাষা মিঠানোর জন্য এবং সামান্য ত্রানের জন্য ছুটছে নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, শিশু থেকে বৃদ্ধ।

উখিয়া-টেকনাফ এই দুই উপজেলার আনাচে কানাছে, বিভিন্ন সড়কের পাশে, পাহাড়ে জঙ্গলে, চারিপাশে এখন শুধু রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা।

দুচোখ যে দিকে যায় শুধু অসহায় রোহিঙ্গাদের জন-গোষ্টীর সংখ্যা চোঁখে পড়ে। কোলে শিশু, অল্প বয়সী ছেলের কাঁধে বৃদ্ধ মা-বাবা, সীমাহীন পথ পাড়ি দিয়ে দূরন্ত গতিতে ছুটছে একটু আশ্রয়ের আশায়।

তাদের সম্বল বলতে পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছু নেই। সড়ক পথে আসা খাদ্যবাহী কোন গাড়ি দেখলে পেছন পেছন ছুটে যায় তারা। শুধু সামান্য ত্রাণ পাওয়ার আশায়। ত্রাণের পেকেট হাতে পেলে তাদের চোখ মুখে দেখা যায় উচ্ছ্বাস, আনন্দ, উদ্দীপনা।

মনে হয় পুরো পৃথিবীটা কাছে চলে এসেছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের দুঃখ, দুর্দশা, তার পাশাপাশি ত্রাণের জন্য হাহাকার প্রতিনিয়ত চোঁখে পড়ার মত দৃশ্য। বৃষ্টি এবং প্রচন্ড রোধের কবল থেকে বাঁচতে এক টুকরো পলিথিনের ছাউনি যেনো তাদের কাছে সোনার হরিণ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল গুলোর নিয়ে আসা ত্রাণের গাড়িগুলোকে রীতিমতো ঘিরে ধরছেন এই নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গারা।

গত দুই এক দিন ধরে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের অমানবিক চিত্র গুলো ফুটে উঠেছে। এখনো খোলা আকাশের নিছে রোধ আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়।

অনেকেই কোন রকম সামান্য প্লাষ্টিক দিয়ে পাহাড়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বয়স্ক নারী-পুরুষ ও শিশুরা।

অনেকে বৃষ্টিতে ভিজে রোদে শুকাচ্ছেন। এখন এই চিত্রগুলো এই এলাকার নিত্য-নতুন। এই অসহায় রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্য থেকে মৃত্যুর ভয়ে মাইলের পর মাইল, পায়ে হেঁটে, বৃষ্টিতে ভিজে, নদী-পাহাড় পার হয়ে বাংলাদেশে এসেও চরম দুর্ভোগের সাথে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে যাচ্ছে।

কারন রাখাইন সেনারা নিজ দেশের বসতঘর পুড়ে লুট করে নিয়ে গেছে সমস্ত সম্পদ, এমন পরিবারেরর সদস্য রয়েছে একজন ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। সব কিছু হারিয়ে তারা এখন অসহায়।

বাংলাদেশে আসা এই সমস্ত রোহিঙ্গারা টেকনাফ থেকে উখিয়া পর্যন্ত সড়কের দুইধারে পাহাড়ে জঙ্গলে যে যেখানে পারছে সেখানে অবস্থান নিচ্ছে।

টেকনাফ উপজেলার পৌর শহরের ছিদ্দিক মার্কেটের সামনে সড়কের পাশে বসে কাঁদছেন অসহায় রাজিয়া, কোলে ১ বছরের শিশু রুবেল। সেও কান্না করছেন। মা-ছেলের কান্না দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি উপস্থিত জনতা। কথা হয় রাজিয়ার সাথে। সে জানায়, তাদের এলাকায় মিয়ানমার সৈন্যরা রীতিমতো ভয়ঙ্কর তান্ডব চালিয়েছে। যাকে পেয়েছে তাকে মেরেছে। গুলি করেছে, কুপিয়েছে, ঘরে আগুন দিয়েছে। তার আপন ছোট ভাই শুক্কুরকে সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করেছে।

কেবল প্রাণে বাঁচতেই স্বামী নুর হোসেনকে নিয়ে এপারে এসেছেন। নুর হোসেনও অসুস্থ। এখন কোথায় গেলে তাদের সুন্দর বসতি স্থাপন হবে সেই চিন্তায় দিশেহারা স্বামী আর স্ত্রী। সামান্য খাবারের আশায় স্বামীকে মার্কেটের সামনে রেখে সে সড়কের পাশে এসেছেন এক প্যাকেট ত্রাণের আশায়। শুধু রাজিয়া নয় এমন হাজার হাজার নারী-পুরুষের অবস্থা একই নিয়মে দেখা যাচ্ছে।

এদিকে মানবিক সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুঁটে এসেছে বিভিন্ন শ্রেনী পেষার মানুষ। সেই ত্রাণ নিয়ে নিজের ক্ষুধা নিবারন করতে এবং প্রাণে বাঁচতে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের।

আবার অসহায় রোহিঙ্গাদের জিম্মী করে নিজের পায়দা হাসিল করছে স্থানীয় দালাল চক্র। অপরদিকে উখিয়া টেকনাফের সামাজিক বনায়নের জায়গায় থাকার জায়গা দিতে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠছে স্থানীয় অসাধু লোকজনের বিরুদ্ধে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, গত ২১ দিনে কম পক্ষে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

জাতিসংঘের অনুমান, গত ২৫ অক্টোবর থেকে এই পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে অন্তত তিন লাখ মত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে। আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: