Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / শরণার্থী সমাচার / বিভিন্ন ভাইরাস রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা : রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় এলাকাবাসী

বিভিন্ন ভাইরাস রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা : রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় এলাকাবাসী

গিয়াস উদ্দিন ভুলু; টেকনাফ :

পার্শ্ববর্তীদেশ মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট সহিংস ঘটনার পর থেকে পালিয়ে এসেছে প্রায় ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা। এখনো টেকনাফ উপজেলার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এখনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এ সমস্ত রোহিঙ্গারা রাতের অন্ধকারে স্থানীয় দালাল চক্রের সহযোগীতায় সাগর ও নদীতে মাছ শিকারে ব্যবহার করা নৌকা ও ট্রলারে টেকনাফ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা দিয়ে নিয়ে আসছে। তার বিনিময়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার। উপকূলে প্রবেশ করার পর এ সব রোহিঙ্গারা বিভিন্ন গাড়ী যোগে  চলে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরী করা ক্যাম্পগুলোতে।

এদিকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবার প্লাষ্টিকের ছাউনি দিয়ে ঝুপড়ী ঘর তৈরি করলেও এখনো শত শত রোহিঙ্গা টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করেছে। তবে এই সমস্ত অস্থায়ী বস্তিগুলো থেকে ভাড়া হিসাবে নগদ টাকা আদায় করে যাচ্ছে কিছু অর্থলোভী অসাধু ব্যক্তিরা। তার পাশাপাশি নতুন আসা অনেক রোহিঙ্গা পরিবার এখনো খোলা আকাশের নিচে।

অপরদিকে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্ত অতিক্রম করে এখনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। গত কয়েকদিন ধরে শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করে দেখা যায়,মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুরা হেপাটাইটিস বি,সি ও ই ভাইরাস রোগসহ বিভিন্ন কঠিন রোগে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস বি,সি ভাইরাস রোগটি মানুষের জন্য একটি মারাত্মক রোগ বলে জানান স্থানীয় চিকিৎসকরা এবং রোহিঙ্গাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন প্রকার ভাইরাস রোগগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে বলে জানান তারা। আক্রান্ত রোগীদের পায়খানা পশ্রাব থেকে এই রোগগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ রোগ নির্ণয় করতে চট্টগ্রাম ডিএনএ সেন্টারে স্ক্যানিং টেষ্ট করতে হয়। সেই রকম কোন যন্ত্রপাতি টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে নেই।

এ ব্যাপারে টেকনাফ হাসপাতালের কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. টিটু চন্দ্র শীল জানান, এ রোগে আক্রান্ত হওয়া মিয়ানমারের এই পর্যন্ত অনেক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রাশিদং, বুসিদং, বাগগুনা, পেরামপ্রু এলাকায় তেমন কোন চিকিৎসা সেবা নেই। তাই এই সমস্ত এলাকার রোহিঙ্গা বিভিন্ন প্রকার ভাইরাস রোগে আক্রান্ত। তাদের বেশী সমস্যা হলে স্থানীয় হাতুরে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা নিত। এর ফলে দিনে দিনে এই রোগগুলো জটিল আকার ধারণ করে শরীরে নানা রোগ সৃষ্টি করে। আবার অনেক সময় তারা উন্নত চিকিৎসা গ্রহন করতে যে কোন উপায়ে বাংলাদেশে চলে আসত।

তিনি আরো বলেন, গত এক মাস ধরে হেপাটাইটিস ভাইরাস রোগসহ বিভিন্ন কঠিন রোগে আক্রান্ত প্রায় তিন শতাদিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেক রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে পরীক্ষা করে এই সমস্ত রোগ সনাক্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে নিমোনিয়া ও ডাইরিয়া রোগী বেশি বলে জানা গেছে। মায়ানমারে ঘটনার পর থেকে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা আসা শুরু হলে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোহিঙ্গা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হাসপাতালে বর্তমানে আউটডোরে প্রতিদিন সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ মত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তৎমধ্যে দুই ভাগই রোহিঙ্গা রোগি বলে জানা গেছে। এর আগে প্রতিদিন ২ থেকে আড়াইশ মত রোগিকে চিকিৎসা দেওয়া হত। এতেও ক্যাম্পের রোহিঙ্গা রোগিদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা পরিবার গুলোকে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে উপকূলে পৌঁছতে সপ্তাহ দশ দিন সময় লাগে। এর পর আরও কয়েকদিন লাগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসত। পথে একটানা হাঁটা আর খোলা আকাশের নীচে রাতযাপন ছাড়া কোনও বাড়ি ঘরে আশ্রয়ের সুযোগ নেই। বৃষ্টিতে ভিজে ও ঘামে অসুস্থ হয়ে পড়ছে কয়েকদিন থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের শিশুরা।

টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. টিটু চন্দ্র শীল জানান, চলতি মাসের ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার পর্যন্ত টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০৫ জন শিশু রোগিকে ভর্তি করা হয়েছে। এর বাইরে আশংকাজনক অবস্থায় আরও সাত শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন।

তিনি জানায়, দীর্ঘদিন পাহাড়, জঙ্গল, বৃষ্টি ও সাগরে ভিজে প্রায় শিশুই নিমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া বিশুদ্ধ খাদ্যের অভাবে শিশুরা ডায়রিয়ায় রোগে ভোগছেন। তবে প্রতিদিন আউটডোরে কয়েক শত রোগির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে আশংকাজনকদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এটি ৫০ শয্যা হাসপাতাল। এরপরও আমরা দ্বিগুণ রোগি ভর্তি দিচ্ছি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: