Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / বিনোদন ও সাংস্কৃতিক / লোকসংস্কৃতির আরেক ঐতিহ্য ‘পালাগান’ দেখতে চকরিয়ায় শতশত নারী-পূরুষের ভীড়

লোকসংস্কৃতির আরেক ঐতিহ্য ‘পালাগান’ দেখতে চকরিয়ায় শতশত নারী-পূরুষের ভীড়

মুকুল কান্তি দাশ; চকরিয়া :

একসময় পালাগান, কবিরগান, নাটক, পুঁথিপাঠ ছিল গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী অনুষ্টান। এসব অনুষ্টান দেখতে হিন্দু-মুসলমান একসাথে জমায়েত হতো। ফলে সব সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেসব অনুষ্টান এখন আর চোখে পড়ে না। যার কারণে সমাজে দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা। সৃষ্টি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভেদ। তবে দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে এ গানের যে এখনও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে তার প্রমাণ মিললো আবারো।

আর সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরশহরের প্রাণকেন্দ্র নাথপাড়াস্থ ৫ রাস্তার মাথায় আয়োজন করা হয় মনসা পুঁথি উপলক্ষে পালাগানের আসর। বৃহস্পতিবার রাত ১০ টায় শুরু হওয়া পালাগান শেষ হয় শুক্রবার ভোরে। পালাগানে অংশ নেন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এলাকার পালাকীর্তন শিল্পী সন্তোষ রুদ্র ও চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকার শিল্পী রনজিত কৃষ্ণ দাশ রঞ্জু। পালাগান দেখতে শতশত নারী-পুরুষের ভীড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পালাগান উপলক্ষ্যে অনুষ্টান স্থলকে সাজানো হয়েছে নানা রঙ্গে। বিনোদন ক্ষুধা মেটাতে স্থানীয় এলাকাবাসী এ গানের আয়োজন করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রাবণ মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের আরেক দেবি মা মনসার’ পূজা-অর্চনা হয়। একসময় এপূজা উপলক্ষ্যে সারামাস ব্যাপী বিভিন্ন পাড়ায়-মহল্লা, মন্দিরে ও প্রতি ঘরে ঘরে আয়োজন করা হতো মা মনসার পুঁথি পাঠ ও পালাগানের। সারারাত চলতো পুঁথিপাঠ ও পালাগান। সেসময় পুঁথিপাঠে আসা আগত ভক্তের দেয়া হতো নানা উপাদেয় খাদ্য সামগ্রী। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই পুঁথিপাঠ ও পালাগান হারিয়ে গেছে।

বাংলা লোকসংস্কৃতির বিশাল অংশ জুড়ে আছে পুঁথিপাঠ, পালাগান বা কবির গান ও নাটক। গত একযুগ আগেও এ অঞ্চলের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পালাগানের আসর বসতো। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবসহ আধুনিক গানের বিকাশ লাভ করায় ঐতিহ্যবাহী পালাগানের আয়োজনে ভাটা পড়েছে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকাও বড় কারণ বলে মনে করছে সচেতনমহল।

পালাগান দেখতে আসা ৬০ বছর বয়সি বৃদ্ধা রেণু বালা জানান, এইতো বেশ কয়েক বছর আগেও পুতিপাঠ, পালাগান, কবিরগান দেখতে যেতাম বিভিন্ন বাড়িতে। সারাদিন কর্মব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যার পরপরই বিভিন্ন বাড়ির উঠানে আয়োজন করা হতো এসব অনুষ্টানের। তখন হিন্দু-মুসলমান কোন ভেদাভেদ ছিলনা। এখনকার লোকজন এসব গান জানে না। অনেকদিন পর পালাগানের আয়োজন দেখে খুব ভাল লাগছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক আশীষ বসাক বলেন, নানা-নানী, বাবা-মা’র কাছে শুনেছি একসময় সব সম্প্রদায়ের লোকজন এক হয়ে সারারাত পুঁথিপাঠ, পালাগান, কবির গানসহ নানা অনুষ্টানের আয়োজন করতো। কিন্তু সেই সোনালী সময় আমরা পাইনি। কিন্তু এলাকার ছেলেরা ঐতিহ্য ধরে রাখতে মা মনসার পুঁথিপাঠ উপলক্ষ্যে যে পালাগানের আয়োজন করেছে সেটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এই ধরনের অনুষ্টান আয়োজন করলে সম্প্রাদায়িক সম্প্রতিও বজায় থাকবে বলেও আশা করি।

আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য প্রবাল মিত্র বলেন, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে এ গানের আয়োজন করা হয়েছে। চেষ্টা করবো ঐতিহ্যবাহী যেসব অনুষ্টান আগেকার দিনে আয়োজন করা হতো সেসব অনুষ্টান আয়োজনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবো।

Leave a Reply

%d bloggers like this: