Home / প্রচ্ছদ / উখিয়ায় এক প্রতিবন্ধীর পরিবারের ঘোর অন্ধকার : দেখার কেউ নেই

উখিয়ায় এক প্রতিবন্ধীর পরিবারের ঘোর অন্ধকার : দেখার কেউ নেই

Jushan (pic) 25-8-2015 (1)হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া :

ছমুদা বেগম, বয়স ৭০ এর কাছাকাছি। স্বামী বাদশা মিয়া মারা গেছে প্রায় ৩৫ বছর পূর্বে। স্বামীর রেখে যাওয়া দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে প্রয়াত স্বামীর ভিটে আকঁড়ে আছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহায়তায় বিয়ে দিয়েছে। ছেলে-মেয়েরা নাতনি-নাতনি নিয়ে আছে। তবে মেঝ ছেলে জামাল উদ্দিন (৪০) ও তার পাঁচ ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে খেয়ে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় জীবন কাটাচ্ছে। ছমুদার মেঝ ছেলে জামাল ও পাঁচ নাতি-নাতনী শারিরীক, বাক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। তাদের জন্যই কক্সবাজারের উখিয়ায় পশ্চিম রত্না গ্রামের অবলা বৃদ্ধা ছুমুদা বেগমের জীবন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা।

উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নের পশ্চিম রত্না গ্রামের রেজু খালের পূর্ব পাড়ে স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় পনের শতক জমির উপর কাঁচা ঘরে ছমুদা বেগমের বসবাস। ইতিমধ্যে রেজুর খালের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বসতভিটার কিছু জমি হারাতে হয়েছে। ছমুদা বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে জানায়। অনেক দিন আগে স্বামী শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে মারা যায়। এসময় সহায় সম্বল বলতে একটি কাঁচা ঘর, ছেলে-মেয়ে গুলো রেখে যান। বড় ছেলে কামাল পাশ্ববর্তী গ্রামে আলাদা ভাবে সংসার নিয়ে কোন রকমে আছে। মেয়ে গুলো শশুর বাড়ীতে নিজ নিজ সংসার নিয়ে কোন মতে ভাল আছে। সে জানায় মেঝ ছেলে জামালকে নিয়ে স্বামীর ঘরে থাকত।

জামাল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল, হাট বাজারে টুকটাক ব্যবসা করে সংসার চালাতো, প্রায় ১৬ বছর পূর্বে জামালকে বিয়ে দিই। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় জামালের চোখে রোগ দেখা দেয়। চোখে কম দেখতে শুরু করে। ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়।

চিকিৎসকরা জামালের ডান চোখ অপারেশন করে তুলে নেয়। এর পর কিছুদিন ঝাপসা দেখলেও পরে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়। এরপর পর সম্পূর্ণ সুস্থ জামালের পাঁচ ছেলে মেয়ে অন্ধ হয়ে পড়ে। সামর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারছেনা।

জামালের পাঁচ বছরের ছোট ছেলে সাইমন জন্মের পর থেকে দৃষ্টি, বাক ও শারিরীক প্রতিবন্ধি। জামালে বড় ছেলে মোঃ আরমান (১৫), এক মাত্র মেয়ে জেসমিন (১৩) গত বছর দৃষ্টিশক্তির কারণে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। জিহাদুল ইসলাম (১১) এখনো কাছ থেকে একটু একটু দেখে এবং স্থানীয় আনন্দ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। কয়েক বছর আগে স্বামী ও ছেলে মেয়েদের এঅবস্থায় ফেলে পুত্রবধু অন্য জনের সাথে বিয়ে করে চলে যায়।

ছমুদা আরো জানায়, সরকার প্রদত্ত বয়স্ক ভাতা ও অন্ধ ছেলে জামাল সমাজ সেবা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত প্রতিবন্ধি ভাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে। ঘরের চালা মেরামত করতে না পারায় চালার উপর নারকেল ও সুপারির পাতা দিয়েছি প্রতিবেশীদের সহযোগিতায়। তবে বৃষ্টি হলে ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ে।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধি জামাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানায়, জানি না আমার কেন এমন হল। কী ভাবে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাঁচব জানি না। হয়ত যথাযথ চিকিৎসা করতে পারলে ছেলে মেয়ে গুলোকে ভাল করতে পারতাম। কিন্তু সেই সামর্থ আমার নেই। জামালের বড় ছেলে মোঃ আরমান ও মেয়ে জেসমিন জানায় আমরা সকলে ভাল ছিলাম। কিন্তু কেন এমন হল জানিনা। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা সকলে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলি। এখনো কিছু কিছু কাছ থেকে দেখতে পাই।

দৃষ্টিশক্তির কারনে আরমান গত বছর স্থানীয় পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণী এবং জেসমিন পশ্চিম রত্নাপালং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে একই বছর পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনি পরীক্ষা না দিয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আরমান ও জেসমিন জানায় তাদের ও অন্য দশ শিক্ষার্থীর মত হৈ হুলে­াড় করে স্কুলে লেখা পড়া করে ঘরে ফিরে জীবন কাটাতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় বিনা চিকিৎসায় বৃদ্ধা দাদির উপর ভর করে ধুঁকে ধুঁকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হতে হচ্ছে। বৃদ্ধা দাদিরও চুখের সমস্যা নানা রোগে সেও কাতর।

মেঝ ছেলে ১১ বছরের জিহাদুল ইসলাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলতে থাকে জানিনা আমরা কী করে বাঁচব। আমরা সুস্থ হয়ে বাঁচতে চাই। সু-চিকিৎসা ও সক্ষমতার অভাবে আমরা ৫ সদস্যের একটি পরিবারের হয়ত শেষ ঠিকানা হবে বসত ভিটা সংলগ্ন রাক্ষুসী রেজু খাল।

রত্নাপালং ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল কবির চৌধুরী বলেন, এধরনের অসহায় একটি পরিবার আমার ইউনিয়নে রয়েছে সে ব্যাপারে কেউ কোন সময় বলেনি। আমি অবশ্যই এই পরিবারের খেয়ে পড়ে বাঁচার মত চেষ্টা করে দেখব।

উখিয়া উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়োজিত সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান বলেন, অসহায় পরিবার হয়ে থাকলে একই পরিবারের একাধিক সদস্য সরকারি সুযোগ সুবিধা আওতায় আসতে সমস্যা নেই। আমি চেষ্টা করবো এই পরিবারের সদস্যরা যাতে সরকারী ভাতার আওতায় আসে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: