Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / আন্তর্জাতিক / মিয়ানমারের শক্তির উৎস কোথায়

মিয়ানমারের শক্তির উৎস কোথায়

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাড়িঘরে আগুন লাগাচ্ছে। নারী-শিশু নির্বিচারে হত্যা করছে। চালাচ্ছে ধর্ষণ।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, রাখাইনে এখন লাশ আর লাশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের প্রতিবাদের মুখেও গণহত্যা অব্যাহত গতিতে চলছে। কোথাও কোথাও বাড়ানো হয়েছে তাদের কার্যক্রম। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে- তাদের শক্তির উৎস কোথায়।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সরকার ও সেনাবাহিনীর অব্যাহত গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববাসী সোচ্চার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন নোবেল বিজয়ীরা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন।

এ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও সোচ্চার। কিন্তু কারো কথা শুনছে না মিয়ানমার। মানছে না কোনো কিছু। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ গ্রাম মানুষশূন্য করে ফেলেছে। রাখাইনে যেসব গ্রাম অক্ষত রয়েছে, সেখানেও আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর, রাখাইনে অলআউট ক্র্যাকডাউন শুরু করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেখানে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখতে চায় না তারা। তাদের লক্ষ্য- রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা মুসলিমশূন্য করা।

মংডুর রাচিডং এলাকার কৃষক সানাউল্লাহ ১৪ দিন আগে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, হঠাৎ দেখতে পান মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে প্রবেশ করছে। এ সময় তারা দুই ভাই বাড়ির এককোণে নারীবেষ্টিত হয়ে লুকানোর চেষ্টা করেন। মগদের সহায়তায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের দুই ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় তিনি দৌড় দেন। সেনাবাহিনী গুলি করে। গুলি তার পেটের চামড়ার ওপরে লাগলে প্রাণে বাঁচেন। তবে গুলিতে প্রাণ যায় তার ভাইয়ের।

এর পর সেনাবাহিনী না যাওয়া পর্যন্ত জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী তার বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সানাউল্লাহর প্রশ্ন, কবে থামবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা-বর্বরতা? কবে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে পারবেন?

মিয়ানমারের রাখাইনের এ চিত্র এখন রোহিঙ্গাদের নিয়তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলেও বেশ কয়েকটি শক্তিধর দেশ মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিবৃতি দিয়ে চীন পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আগে এমন ঘোষণা দেয় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশটি।

গত মঙ্গলবারও আরেকটি বিবৃতি দিয়েছে চীন। দেশটি ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ রক্ষায় মিয়ানমার সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, মিয়ানমার তাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য যে চেষ্টা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদের পাশে থাকা।

রোহিঙ্গা সংকটকে সু চি সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় দাবি করে দেশটিতে বাইরের হস্তক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান জানিয়েছে রাশিয়া। তারা বলছে, আমরা মনে করছি, এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই দেশটির উভয়পক্ষ বসে এর সমাধান করুক। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারোভা এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ হস্তক্ষেপের উদ্যোগ শুধু ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, এটি মনে রাখা দরকার- একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ইচ্ছা কেবল আন্তঃধর্মীয় বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে।

এদিকে মিয়ানমারের পাশে ভারতের অবস্থান অনেক আগেই জানিয়েছে ভারত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, রাখাইনের সংঘাত নিয়ে মিয়ানমারের মতোই উদ্বিগ্ন ভারত। সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে ওই দেশের নেত্রী ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান মোদি।

তিনি বলেন, ভারত মিয়ানমারের পাশে রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে সেনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনহানি নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। সংবাদ সম্মেলনে জাতি হিসেবে মিয়ানমারের সংহতি রক্ষা ও উদ্বেগের প্রতি সব পক্ষকে সম্মান জানানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ইসরায়েলের হাইকোর্টে মিয়ানমারের কাছে অব্যাহত অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে মানবাধিকারকর্মীদের এক আবেদনের শুনানি হবে। মার্চ মাসে প্রাথমিক শুনানিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণলায় যুক্তি তুলে ধরে জানায়, এ বিষয়ে আদালতের কিছু করার নেই, বিষয়টি পুরোপুরি কূটনৈতিক।

অন্যদিকে হিন্দুস্তান টাইমস সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েল অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মিয়ানমারকে সহযোগিতা করছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক বসতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে মিয়ানমারের বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দেবে চীন। একই অবস্থান নিতে পারে রাশিয়াও। ফলে মিয়ানমারের যে কোনো কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমালোচনা ও চাপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গণহত্যার মতো নিন্দনীয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সাজানো সংসার ফেলে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। তারা যেন আবার রাখাইনে ফিরতে না পারে সে জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। সেই মাইন বিস্ফোরণেও একের পর এক রোহিঙ্গা নারী-শিশু মারা যাচ্ছে। মাইন বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এভাবে স্থলমাইন পুঁতে রাখা বেআইনি। কিন্তু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না মিয়ানমার। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ যত বাড়ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও গণহত্যার মাত্রাও তত বাড়ছে। তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না কোলের শিশুও। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশগুলো শুধু বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েই চুপ করে আছে।

সূত্র:deshebideshe.com,ডেস্ক।

Leave a Reply

%d bloggers like this: