Home / প্রচ্ছদ / সাম্প্রতিক... / ধর্ম / বড়দিনের যত কথা

বড়দিনের যত কথা

এই দিনে ফিলিস্তিনের বেথলেহেমের এক জীর্ণ গোশালায় জন্ম নিয়েছিলেন এক মহামানব, যিশুখ্রিস্ট। তখন থেকেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটিকে বড়দিন হিসেবে উদযাপন শুরু করে। প্রতিটি মানুষের মন ভালোবাসা ও ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল করে তোলাটাই এই উদযাপনের লক্ষ্য। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিশ্বজুড়েই সব মানুষের হূদয়ে সঞ্চার করে উৎসব-মাধুর্য। উপহার আদান-প্রদান, সান্তা ক্লসের চকলেট ও ক্রিসমাস ট্রি এই দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। লিখেছেন— তানিয়া জামান ও সাইফ ইমন


দেশে দেশে বড়দিনের উৎসব

খ্রিস্টানরা বড়দিন উদযাপন করে নানাভাবে। বর্তমানে গির্জার উপাসনায় যোগ দেওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম জনপ্রিয় প্রথা। বড়দিনের আগে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ নেটিভিটি উপবাস পালন করে থাকে। বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেওয়া হয় ক্রিস্টমাসের পূর্বসন্ধ্যায়। বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম দিক হলো গৃহসজ্জা ও উপহার আদান-প্রদান। এই উৎসবে ছোট ছেলেমেয়েদের দিয়ে খ্রিস্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় এবং ক্যারোল গাওয়ার প্রথা আছে। আবার খ্রিস্টানদের কেউ কেউ তাদের ঘরের সামনে খ্রিস্টীয় ধর্মের অন্তর্গত চরিত্রের পুতুল সাজিয়ে প্রদর্শনী করে থাকেন। এই দৃশ্যকে ক্রিব বলা হয়। চিত্রশিল্পে যিশুর জন্মদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার ঐতিহ্যটি সুদীর্ঘ। এই দৃশ্যে মেরি, জোসেফ, শিশু যিশু, স্বর্গদূত, মেষপালক থাকে। যেসব দেশে খ্রিস্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। অনেক ক্যাথলিক দেশে ক্রিস্টমাসের আগের দিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্তা ক্লস ও মৌসুমি চরিত্রদের নিয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই মৌসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হলো পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদান-প্রদান। আবার কোনো কোনো দেশে এই প্রথাটির জন্য বেছে নেওয়া হয় ৬ ডিসেম্বরের সেন্ট নিকোলাস ডে বা ৬ জানুয়ারির এপিফেনির দিনগুলো। ইংল্যান্ডের পারিবারিক ভোজসভায় থাকে ক্রিস্টমাস পুডিং। ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য একেক দেশে একেক রকম হয়। সিসিলি প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চলে ক্রিস্টমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে থাকে বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত দেশে বড়দিনের ভোজসভায় দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনা), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি ছাড়াও থাকে ক্রিস্টমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। তবে এসব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের ব্যবহারও হয়। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্টিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপাইনে ভোজসভার প্রধান খাদ্য হলো হ্যাম। বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে বিশেষ ডেজার্টও তৈরি হয়। খ্রিস্টমাস উপলক্ষে মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়।

খ্রিস্টমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন, মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তরের দেশগুলোতে শীতকালে যে অল্প কটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু ক্রিস্টমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত। বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিস্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসীরা চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা দিয়ে বাড়ি সাজাত। খ্রিস্টানরা এ জাতীয় প্রথাগুলোকে তাদের সৃজ্যমান রীতি-নীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রতিটি বাড়ি ও গির্জা হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মৌসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হতো। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টান বিশ্বে স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সজ্জার প্রথা চালু রয়েছে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় বাড়ির বাইরে আলোকসজ্জা এবং আলোকিত পুতুল সাজানোর প্রথা রয়েছে। রাস্তার বাতিস্তম্ভে ক্রিস্টমাস ব্যানার লাগানো হয় এবং টাউন স্কয়ারে স্থাপন হয় ক্রিস্টমাস বৃক্ষ।

পাশ্চাত্য বিশ্বে খ্রিস্টমাস মোটিফসহ উজ্জ্বল-রঙের রোল করা কাগজ উৎপাদিত হয় উপহারের মোড়ক তৈরির জন্য। অন্যান্য প্রথাগত সাজসজ্জার অঙ্গ হলো—ঘণ্টা, মোমবাতি, ক্যান্ডি ক্যান, মোজা, রিদ ও স্বর্গদূতগণ। অনেক দেশে নেটিভিটি দৃশ্যের উপস্থাপনা বেশ জনপ্রিয়। এসব দেশে জনসাধারণকে সম্পূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত নেটিভিটি দৃশ্য সৃজনে উৎসাহিত করা হয়।

ক্রিসমাস ট্রি কাহিনী

ক্রিসমাস ট্রি যেন ক্রিসমাস উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। এই উৎসবে ক্রিসমাস ট্রি উপহার দেওয়া বর্তমানে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কালচারে পরিণত হয়েছে। তবে এই ক্রিসমাস ট্রি বড়দিনের উৎসবের সঙ্গে কিভাবে জড়িয়ে গেল তা নিয়ে অনেক রকম মিথ রয়েছে। একটা মিথ বলছে, ১৫৩৬ সালের এক শীতের রাতে মার্টিন লুথার নামের এ ধর্মতাত্ত্বিক তার বাড়ির কাছের পাইন বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গাছের ডালে অসংখ্য তারা ঝলমল করতে দেখেন। তখন তিনি ক্রিসমাস ট্রিকে আলো দিয়ে সাজিয়ে তোলার কথা প্রথম ভাবেন। বেশির ভাগ মানুষের দাবি, ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর প্রথা চালু করেন খ্রিস্ট ধর্মের সংস্কারক এই মার্টিন লুথার। অন্য এক মিথে বলা হচ্ছে, রোম নগরীতে এক দরিদ্র শীতার্ত শিশু এসে হাজির হয় এক ঘরে। ঘরটি ছিল গরিব এক কাঠুরের। এই কাঠুরে এবং তার স্ত্রী ছিলেন যিশুভক্ত। তারা শিশুটিকে ঘরে নিয়ে নিজেদের খাবার খাওয়ালেন। শিশুটিকে নরম বিছানায় শুতে দিয়ে নিজেরা শুলেন শক্ত কাঠের ওপরে। সকালে সেই শিশু দেবদূতের রূপ ধারণ করে বলল, তিনিই স্বয়ং যিশু। কাঠুরে দম্পতির আচরণে খুশি হয়ে একটি গাছের টুকরা দিয়ে শিশুরূপী যিশু বললেন তা মাটিতে পুঁতে দিতে। দম্পতিটি তাই করলেন। এরপরের ক্রিসমাসে দেখা গেল ওই ডালটি সোনালি আপেলে ভর্তি হয়ে গেছে। আবার অনেকের মতে মধ্যযুগে অনেক মানুষ ক্রিসমাস ট্রিকে সম্বোধন করতেন ট্রি অব প্যারাডাইস নামে। তখনকার মঞ্চনাটকগুলোতে স্বর্গের গাছের রূপক হিসেবে ক্রিসমাস ট্রি ব্যবহূত হতো। যার ডালে ডালে ঝুলত আপেল। এসব নাটক মঞ্চস্থ হতো ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ও বিনোদনের জন্য। পরে মানুষ ওই ধরনের ছোট ছোট গাছ ঘরে নিয়ে রাখতে শুরু করে। এরপর আপেলের জায়গা নিতে থাকে নানা রঙের চকচকে বল ও সুগারক্যান্ডি।

ক্রিসমাস ট্রি নিয়ে আরেকটা মিথ আছে এরকম, এক ক্রিসমাসে এক গির্জার মালির কাছে এলো এক শিশু। সে সাথে করে কিছু পাইন গাছের চারা নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। চারাগুলো বেচে যে টাকা পাবে সেই টাকা দিয়ে সে ক্রিসমাসে কিছু কিনতে পারবে। সব দেখে মালির খুব দয়া হলো। যদিও পাইনের চারাগুলো মোটেও ভালো না, তবুও সেই মালি চারাগুলো কিনে নিল এবং গির্জার পাশে চারাগুলো পুঁতে ঘুমিয়ে গেল। আর সকালে উঠে দেখে অবাক কাণ্ড, এক রাতেই পাইনের চারাগুলো বড় হয়ে ছাড়িয়ে যায় গির্জার সব চারাকে! আর এই গাছগুলো আর তার ডালপালা থেকে ঠিকরে বেরোতে থাকে অজস্র তারার আলো।

আমেরিকার সাহিত্যে প্রথম ক্রিসমাস ট্রি আসে ১৮৩৬ সালে। নিউ ইয়ারস ডে নামের একটি গল্পে। যার লেখক ক্যাথরিন মারিয়া। গল্পটিতে এক জার্মান গৃহপরিচারিকা মনিবের জন্য একটি ক্রিসমাস ট্রি সাজায়। আর ক্রিসমাস ট্রিতে বৈদ্যুতিক বাতি ঝোলানোর চল করেন এডিসন কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডওয়ার্ড জনসন ১৮৮২ সালে। আধুনিক ক্রিসমাস ট্রির প্রচলন হয় জার্মানিতে ১৮ শতকে। আর ১৮৪১ সালের দিকে ক্রিসমাস ট্রি পুরো ব্রিটেনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর বছর ত্রিশেকের মধ্যে আমেরিকাতেও ক্রিসমাস ট্রি জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৮২ সালে ভ্যাটিকান সিটিতে ক্রিসমাস ট্রির প্রবর্তন করেন পোপ জন পল দ্বিতীয়। ২০০৪ সালে পোপ জন পল ক্রিসমাস ট্রিকে খ্রিস্টের প্রতীক বলে মত প্রকাশ করেন।

ক্রিসমাস কেন এক্সমাস

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব বড়দিনকে ক্রিসমাস বা এক্সমাস যাই বলা হোক না কেন, ২৫ ডিসেম্বর মানেই অনেক অনেক আনন্দ আর ভালোবাসা। এই শুভদিনে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী শান্তিপ্রিয় সবার ত্যাগ ও মহিমায় জীবন উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, এই শিক্ষাই প্রদান করে।

কাগজে-কলমে ক্রিসমাসকে সংক্ষেপে এক্সমাস লেখার অভ্যাস অনেক মানুষেরই রয়েছে। এই শব্দ সংক্ষেপ অনেকে ভালোভাবে গ্রহণ করলেও সর্বত্র এটি প্রচলিত নয়। অনেকে ধারণা করেন এই শব্দ সংক্ষেপ ব্যবহার ঠিক নয়। তবে আবার অনেকেই মনে করেন, এটা সহজে উচ্চারণ করা যায়। সেইসাথে ক্রিসমাসের উৎসবকে যাতে সব ধর্মের মানুষই আপন ভাবতে পারে সেই ভাবনা থেকেই এই এক্সমাস শব্দের উৎপত্তি। অনেকের ধারণা, এক্সমাসের ‘এক্স’ যীশুর ক্রসকে বোঝায়। বাস্তবে এই ধারণার কোন ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন একটা অংশ। কারণ সেন্ট এন্ড্রুর ক্রুশ ‘এক্স’ এর মতো হলেও যীশু খ্রিস্টের ক্রসটি ছিল ইংরেজি অক্ষর ‘টি’ আকারের। অনেক আগের খ্রিস্ট শিল্পকলায় ‘এক্স’ এবং ‘এক্স পি’ খৃষ্টের নামের সংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। নিউ টেস্টামেন্টের অনেক পান্ডুলিপিতে এক্স এসেছে খৃস্টস এর শব্দসংক্ষেপ হিসেবে ।

১৫৫১ সালে জিয়ান ও জিয়ানিটি শব্দ দুটি ক্রিশ্চিয়ান ও ক্রিশ্চিয়ানিটি বোঝাতে ব্যবহূত হয়েছে। এখন এ ধরণের ব্যবহার কমে গেছে। তারপরও একইভাবে ক্রিস্টিনা এগুইলেরাকেও এক্সটিনা বলে ডাকেন অনেকে।

 

বাংলাদেশে বড়দিন

দিনটি সকল খ্রিস্টান ধর্মালম্বির কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, খ্রিস্ট ধর্মালম্বিদের বিশ্বাস শুধু মানুষকে পাপের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে যীশুখ্রিস্ট মহামানব হওয়া সত্বেও জন্ম নিয়েছিলেন এই দিনে ফিলিস্তিনের বেথেলহেমের এক জীর্ণ গোশালায়। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশে দিনটি যথাযথ মর্যাদা আনন্দ ও উৎসাহে পালন করা হয়। দিনটি বড়দের থেকে ছোটদের আনন্দ অনেক বেশি। ছোটরা এই দিনটিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে পছন্দ করে। রঙিন কাগজের শিকলি, আলোকমালায় সাজানো ঘর, সান্তাক্লস, ঝাউগাছ দিয়ে তৈরি ক্রিসমাস ট্রি নতুন জামাজুতা কেক এর পাশে পোলাওয়ের বিশেষ ভোজ- সবকিছুতেই বাঙালিয়ানার ছাপটা ফুটে উঠবেই। এছাড়া মফস্বলে গেলেই টের পাওয়া যায় এখানের ক্রিসমাস সঙ্গীতগুলিও পুরোপুরি বাঙালির। এমনকি দেশের সবচেয়ে উঁচু চুড়া ক্রেওক্রাডাং এর পাদদেশের দার্জিলিং পাড়াতেও দল বেঁধে তরুণ-তরুণীরা বেরোয় এই গান গেয়ে। খোলের সঙ্গে ভাটিয়ালি বা কীর্তনের সুরেও হয় ক্যারল সঙ্গীত। শহরের গির্জাগুলিতে গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের লেখা গানও। যেমন, আজি শুভ দিনে পিতার ভবনে অমৃত সদনে চলো যাই। এমনি ক্রিসমাস গানে মেতে ওঠে খিষ্টান ধর্মলম্বীরা বাঙ্গালী।

যিশু খ্রিস্টের জন্মদিনের উৎসব

বিশ্বজুড়ে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করে। এই দিনে প্রিয়জনকে উপহার দেয়া, সংগীত পরিবেশন, খ্রিস্টমাস কার্ড বিনিময়, গির্জায় ধর্মোপসোনা, ভোজ এবং খ্রিস্টমাস বৃক্ষসজ্জা, আলোকসজ্জায় সাজানো হয় ঘর…

২৫ ডিসেম্বরকে যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন বা বাৎসরিক খ্রিস্টীয় উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। খ্রিস্টান অনুসারিদের কাছে এটি বড়দিন বা প্রধান ধর্মীয় উৎসবের নাম। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস আগে মা মেরির গর্ভে অলৌকিকভাবে প্রবেশ করেন যিশু। অপর এক মতে একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথা চালু হয়। আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে, কুমারী মেরির গর্ভে তাদের ত্রাণকর্তার জন্ম হবে। আর সে নিয়মের বাস্তব রূপ যিশুর জন্ম। সংস্কারকৃত বাইবেলে বলা হয়েছে, যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিস্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। এই উপাখ্যান অনুসারে, হবুস্বামী জোসেফের সাহচর্যে বেথলেহেম শহরে উপস্থিত হয়ে মেরি যিশুর জন্ম দেন। জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। যদিও বাইবেলের উপাখ্যানে আস্তাবল বা গবাদি পশুর কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে একটি যাবপাত্রের উল্লেখ আছে। পরিবারের অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট চিলেকোঠায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচাতে তৎকালীন রেওয়াজ মেনেই খড়ের উপর সদ্যোজাতকে শোওয়ানো হয়েছিল। চিরাচরিত বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দুবছর আগে এমনই চমকপ্রদ তথ্য পেশ করেছেন যাজক আয়ান পল। অনেক খ্রিস্টানই মনে করেন, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীকে পূর্ণতা দেয়। বিশ্বজুড়ে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করে। এই দিনে প্রিয়জনকে উপহার দেয়া, সংগীত পরিবেশন, খ্রিস্টমাস কার্ড বিনিময়, গির্জায় ধর্মোপাসনা, ভোজ এবং খ্রিস্টমাস বৃক্ষসজ্জা, আলোকসজ্জা, মালা, মিসলটো, যিশুর জন্মদৃশ্য, হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার প্রদর্শনী আধুনিককালে বড়দিন উৎসব উদযাপনের অঙ্গ। সান্তা ক্লস কর্তৃক ছোটোদের জন্য বড়দিনে উপহার আনার প্রথাটি বেশ জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও এসব রীতি বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার ভেতর দিয়ে পালন করা হয়।

সান্তা ক্লসের গল্প

বড়দিন এলেই সান্তা ক্লসের কাছ থেকে পাওয়া চকোলেট আর উপহার যেন বাচ্চাদের পরম আরাধ্য। বিশেষ এই দিনে সান্তা ক্লস আসে উপহারের ঝুড়িতে খুশির বারতা বয়ে। সঙ্গে ছোট-বড় সবার জন্য উপহার হিসেবে দেয় নানা রকমের মুখরোচক চকোলেট। তাই হয়তো বড়দিন মানেই যেন সান্তা ক্লসের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার অন্যতম উপলক্ষ—সঙ্গে মণ্ডা-মিঠাই। খ্রিস্টীয় ধর্মের অংশ না হলেও সান্তা ক্লস নামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই নামটি এসেছে খ্রিস্টান ধর্মযাজক সেন্ট নিকোলাসের ওলন্দাজ নাম সিন্টার ক্লাস থেকে। তার জন্ম হয়েছিল আধুনিক তুরস্কের নিকটবর্তী সমুদ্রবর্তী ‘পাতারা’ নামক এক গ্রামে। মায়রার বিশপ নির্বাচিত হওয়ার অল্পদিন পরেই তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর সম্রাট কনস্টেনটাইন ক্ষমতায় আরোহণ করলে তিনি মুক্তি লাভ করেন। সেন্ট নিকোলাস ছিলেন ধনাঢ্য বাবার দয়ালু ছেলে। কথিত আছে, সেন্ট নিকোলাস উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব ধন-সম্পত্তি গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বিপদাপন্ন মানুষের সন্ধানে সেন্ট নিকোলাস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা, এক দেশ থেকে আরেক দেশ চষে বেড়াতেন। সেন্ট নিকোলাস পরিচিতি পেতে থাকেন বাচ্চাদের পরম বন্ধু ও সবার দুর্দিনের সাথী হিসেবে। এভাবেই একসময় সেন্ট নিকোলাস সারা ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় সাধু ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তার মৃত্যুর তারিখ ৬ ডিসেম্বরকে একটি পবিত্র দিন হিসেবে পালন করা হয়। ১৭৭৩-৭৪ এর দিকে একদল ওলন্দাজ পরিবারের সেন্ট নিকোলাসের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সমবেত হওয়ার কথা নিউইয়র্ক পত্রিকাতে প্রথম প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে পরিচিতি পায় নামটি।

সান্তা ক্লসের মহানুভবতা

সান্তা ক্লসের মহানুভবতা নিয়ে অনেকের মনে অনেক শ্রদ্ধা। তার চরিত্র বৈশিষ্ট্য নিরূপণে উপস্থিত হয় অনেক ইতিবাচক তথ্য। তার চারিত্রিক যে বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে সেগুলো তুলে ধরা হল—

>> তখনকার দিনে মায়রায় এক বাবা তিনটি মেয়েকে অর্থাভাবে পতিতা হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন। সেন্ট নিকোলাস রাতের আধারে চুপিসারে গরীব লোকটির বাড়িতে স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ব্যাগ ছুড়ে দেন। ফলে মেয়েদের আর পতিতা হিসেবে বিক্রি হতে হয় না।

>> জন্মের এক সপ্তাহ পর সান্তার মা ছেলেকে চার্চে নিয়ে যান। মাদার মেরির সম্মানার্থে নিকোলাস কারো সাহায্য ছাড়া নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকেন তিন ঘণ্টা।

>> সেন্ট নিকোলাস বিপদগামী যুবকদের ক্ষমা এবং সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে সৎপথে ফেরাতেন।

>> বড়দিনে মোটাসোটা সান্তাক্লসের প্রতিমূতি দেখলেও তিনি বাস্তবে মোটেও মোটা ছিলেন না এবং লম্বা তো ছিলেনই না।

>> সেন্ট নিকোলাসের কবর থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ বের হতো। এটাকে ধর্মযাজকরা ‘মান্না অব সেন্ট নিকোলাস’ নাম দেন।

>> সেন্ট নিকোলাসকে কবর দেয়া হয় তুর্কিতে। অথচ ১০৮৭ সালে ইতালির কিছু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী তার প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের নাম করে তার কবর ভেঙে কঙ্কাল নিয়ে যায়। অথচ তা প্রদর্শন করে পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ উপার্যন করে।

>> নিকোলাসের শরীরের অবশিষ্ট হাড় ছড়িয়ে আছে ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের চার্চে।

 

 

সূত্র:bd-pratidin.com – ডেস্ক।

Leave a Reply

%d bloggers like this: